প্রচ্ছদ

পরসমাপেষু-রুহিঙ্গা

27 November 2016, 15:50

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 330 times.

পরসমাপেষু-রুহিঙ্গা

9
ইয়াকুব আলী, সংস্কৃতিকর্মী সিলেটঃ জাতীয়, উপজাতীয়, অজাতীয়, বিজাতীয়, কুজাতীয়, স্বজাতীয়, লালজাতীয়, বাহারজতীয় বিষয় নিয়ে আমরা প্রগতির বুলি আচড়াইয়া বেড়াই, আন্দোলনে ফেঁটে পড়ি। প্রগতির মিছিলে মানুষের জন্য আন্দোলন করে আসছি প্রতিনিয়ত। সময়ের বলিরেখায় উপচে পড়া ভীড়েও অনেকে ডেকেছেন স্লোগানে সুর মিলাতে।

মানুষ সৃষ্টির পর থেকে মানুষ মানুষের জন্যই লড়াই করে বাঁচতে শিখেছে। তেমনি মানুষে মানুষের মাঝে প্রভাব প্রতিপত্তি ফোঁটানোর জন্য কিংবা নেহাতই আনন্দের জন্যই মানুষ মানুষে-মানুষে হানাহানি কিংবা শক্তি প্রদর্শনের খেলা করে আসছে। কখনো সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যগতভাবে আবার কখনো ধর্মের নামে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্মের জন্য বৃহৎ হানাহানি কিংবা রাজ্যবিস্তারে লাশের বন্যা বয়ে দিয়েছে এই মানুষই। প্রতিকার খোঁজার পথে অনেকে হাটতে যেয়ে আবার হুচট খেয়েছেন। মানুষের মানুষ হয়ে উঠা হয়নি তাতে কী; তবে মানুষের পরিচয়ের উপরে কোন পরিচয় আছে কী আপনার কাছে। তাই আমরা মানুষের গান গাই, মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে আহবান জানাই। গত কয়েকদিন যাবত বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক-উপজাতি হত্যা ও লুন্ঠনের প্রতিবাদ করেছে বাঙালি। সেই প্রতিবাদ মানুষ হিসেবে করেছি আমি। কিন্তু কেউ কেউ মানুষ হিসেবে নয় বরং নিজ গোত্রের জন্য আন্দোলনে নেমেছেন। নিজের প্রতিকৃতিতে ‘মালাউন’ খেতাব জোড়ে প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু সেটা কি মানুষ হিসেবে আপনার ন্যায্য দাবী ছিল নাকি কোন একটা ধর্মীয় কিংবা গোত্রের প্রতিনিধি করার মতো নয় ?

গত ৯ অক্টোবর মায়ানমারে একটি পুলিশ ঘাটিতে কে বা কারা হামলা চালায়, কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা মারা যায়। (সম্ভবত ৭ জন)। সেটা নিশ্চয় অপরাধ। অপরাধী সনাক্ত করে তাদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করুন। আইনের মধ্যে ফাঁসিযোগ্য অপরাধ হলে ফাঁসি দেন। কিন্তু এই ঘটনা নিয়ে মায়ানমানের সেনাবাহিনী কর্তৃক সে দেশের উপজাতি/আশ্রিত/নাগরিকত্বহীন রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে চাপে মেরে ফেলা হচ্ছে। নারীদের উপর চলছে যৌননির্যাতন। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে একনাগাড়ে। প্রায় দুইমাস যাবত এই জাতিগোষ্ঠীর উপর পুনরায় নির্যাতন ও হত্যা-ধর্ষণ চলছে। খোদ গণতন্ত্রের মানসকন্যাখ্যাত নোবেল জয়ী অং সাং সুচি’র কোন উদ্যোগ কিংবা প্রতিক্রিয়া নেই। তাহলে কি ক্ষমতা আপনাকে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগোত্রের আগলে চেপে ধরেছে। ২৬ নভেম্বরের যুগান্তরে কয়েক মায়ানমার পলায়ন নারীর সাক্ষাতকারস্বরুপ একটা প্রতিবেদন পড়েছেন নিশ্চয়। তাদের বক্তব্যে বুঝা যায় কেমন করুন পরিস্থিতি সেখানে বিরাজ করছে রুহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনে। মানুষ বললাম কারণ এরা মানুষ। গত কয়েকদিন ধরে দেখছি একদল ধর্মীয় সম্প্রদায় বলে প্রতাবাদ করছে আর পুরাতন ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাগাভাগি করছে, আর কেউ কেউ সেই ছবিগুলো নিয়ে প্রগতির আচড় বিস্তর করছেন। সঠিক বিষয় সবসময় প্রত্যাশা করে মানুষ। কেউ কেউ এমনও বলছেন নিজের দেশের মানুষকে জ্বালিয়ে পরের দেশের মানুষকে নিয়ে মাতামাতি ঠিক না। কিন্তু নিরপেক্ষতা যদি হয় কিংবা মানুষের জন্যই যদি আন্দোলন করেন তাহলে এইদেশ-ঐদেশ কি? মানুষতো মানুষ। নাকি রুহিঙ্গা জলদস্যু কিংবা নাগরিকত্বহীন বলে এরা মানুষ নয়? কয়েকদিন আগেই অভিবাসীদের জন্য বিশ্ববাসী আন্দোলনে ফেঁটে পড়ে। একটা ছেলের লাশ সমুদ্র হতে ভেসে তীরে ভিড়েছিল, সেই ছবি নিয়ে মানুষজন ক্ষোভের কিংবা প্রতিবাদের স্বরুপ মানুষের পরিচয় বহন করেছিল। আর আজ এরকম শত ছেলে সমুদ্র ভেসে ভেসে কোন দেশেই আশ্রয় পাচ্ছে না। তাহলে কি এরা মানুষ না। নাকি অাগের অান্দোলনকারী মানুষ অার পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই?

বাঙলা তাদের আশ্রয় দিতে পারবে না সেটা হয়তো বাস্তবতা কিংবা আমাদের দেশের অপারগতা। কিন্তু এরা এতদিন থেকে যে দেশে বাস করে আসছে সেখানে তাদের জায়গা দিতে সমস্যা কি? সেটেলমেন্ট জরিপে কাগজপত্র থাকার পরও যাদের দখলে ২০-২৫ বছর ধরে জায়গা থাকে, তাদের নামে রেকর্ড করে দেয়া হয়। আর রুহিঙ্গাতো আকাশ থেকে হঠাৎ একদিন মায়ানমারের ভুমিতে পতিত হয়নি।

কোন ধর্মের নামে আমি কোন কথা বলতে পছন্দ করি না, এমনকি নিজের পরিচয়ও ধর্ম দিতে ইচ্ছে করে না। কেননা আমি বিশ্বাস করি আমি যা লালন করি তাই আমার ধর্ম। তাই তাও বিশ্বাস করি বিভিন্ন ধর্মের লোকেরা যা লালন করে তা তাদের ধর্ম। ধর্ম সত্য কি মিথ্যা এই বিতর্ক আমার কাজ নয়, তাই বলে মানুষকে কোন এক অদৃশ্য বস্তু ধর্ম দ্বারা বিচার করবো? মায়ানমারের বেশিরভাগ মানুষ একটি মতবাদে বিশ্বাসী যা বৌদ্ধমত। যা শান্তি এবং মানব সুখের বাণীবহন করে। আর খোদ সেই শান্তির মহামায়ায় এমন অশান্তির রুপ আকার ধারণ বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর রুহিঙ্গা জাতি গোষ্ঠী অারেকটি মতবাদে বিশ্বাসী তাই বলে বিতাড়িত করে দিতে হবে ? পোশাকধারী সরকারি বাহিনী জ্বালিয়ে দিচ্ছে সন্দেহের বসবর্তী হয়ে একটি মতবাদের জাতিগোষ্ঠীকে।

পুলিশের ফাড়িতে কে বা কারা আঘাত করেছে সেটা উদ্ধার না করে শুধু সন্দেহের বসবর্তীতে শতশত মানুষ মেরে ফেলা কোন সুস্থ জাতির পক্ষে সম্ভব। আমার জানামতে এক হিটলার আর ৭১’এ বাংলাদেশে পাকিস্তানি উন্মাদ। যারা মানসিক বিকারগ্রস্ত তাদের পক্ষে মানুষ হয়ে মানুষ হত্যা বা’হাতের খেল।

আসুন ধর্মীয় পরিচয় ভুলে গিয়ে মানুষ হিসেবে বাঁচি। ধর্মতো তোমার একান্ত ব্যাক্তিগত কিংবা বড়জোর গোত্র থাক। যা তুমি লালন এবং পালন করো। ইহজাগতিক কিংবা পরজাগতিক সেটা একান্তই তোমার। কিন্তু মানুষতো মানুষই-লাল রক্তের মানুষ।

Share

Comments

comments

Shares