প্রচ্ছদ

“তুমি সর্প হইয়া দংশন কর ওঝা হইয়া ঝাড়”-রিপন দে’র কলাম

19 November 2017, 16:24

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 643 times.

বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা রংপুরের ঠাকুরপাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা চালিয়েছে! কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ও তার নেতৃবৃন্দ ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা ও নির্যাতনের পর কেবল বিএনপি জামাতের উপর দোষ চাপিয়েই দায় শেষ করছেন। রামু, নাসির নগর, হাট হাজারী, অভয়নগর সহ অসংখ্য হিন্দু নির্যাতনের সাথে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা কর্মীদের জড়িত থাকার ভুরি ভুরি প্রমাণ থাকা সত্বেও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিশ্বজিত হত্যাকান্ডে জড়িত থাকা ছাত্রলীগ কর্মীরা নিন্ম আদালতে সাজা প্রাপ্ত হলেও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়েছে এবং উচ্চ আদালত থেকে অনেকেই নিষ্কৃতি পেয়েছে। বিষয়গুলো ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য কেবল শঙ্কার নয় গভীর উদ্বেগেরও। কারণ, হিন্দু সম্প্রদায় ৭১ দেখেছে, ৯১ দেখেছে, ২০০১ সাল দেখেছে, প্রায় ৯৫% হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বিএনপি ও জামাত জোটের বিপক্ষে ছিল, ২০০১ সালের নির্যাতনের ঘটনা এখনও মানুষ ভুলেনি। সেটার জবাবে বিএনপি জামাত কখনো হিন্দু সম্প্রদায়ের সমর্থন পায়নি। অন্ধভাবে আওয়ামী লীগ কে সমর্থন করতে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায় ব্যপক অত্যাচার ও নিরযাতনের স্বীকার হয়েছে। কিন্তু যাদের জন্য এতো ত্যাগ, সেই মহান আওয়ামী লীগ কি করেছে! তারা এক দশক ধরে ক্ষমতায় আরোহণ করছে হিন্দু সম্প্রদায়ের নূণ্যতম সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি জমাতের উপর দায় দিয়েছেন ভাল কথা সম্পৃক্তদের ধরে কয়জনের বিচার নিশ্চিত করেছেন? একের পর এক কেন ঘটছে? এই দায় কার? সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম বহাল রেখে আওয়ামী লীগ তার মূল ভিত্তি থেকে যেমন সরে গিয়েছে তেমনি সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে উল্টো তাদেরকে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধী দলেকে ঘায়েল করতে গিয়ে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছে।

দৈনিক ভোরের কাগজের ১৮ ই নভেম্বরের অনলাইন নিউজ অনুসারে “আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত রংপুরের ইকরচালি ইউপির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ও হরিদেবপুর ইউপির চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেনের সম্পৃক্ততার প্রমাণও মিলেছে। ঘটনার পর তদন্তে নেমে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা এসব তথ্য জানতে পেরেছে। সহিংসতায় সম্পৃক্ত আওয়ামী লীগের সেই জনপ্রতিনিধিরাই আবার হামলার প্রতিবাদ জানাতে কর্মী বাহিনী নিয়ে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমাবেশে’ অংশ নিয়েছে! ” বুঝেন এইবার “সর্প হইয়া ধংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়ে” কিনা! অনুসন্ধানী সংবাদ সূত্রে সেখানে বিএনপির ওলামা দলের সভাপতি ইনামুল হক মাজেদী, সদর উপজেলা জামায়াতের আমির আইয়ুব আলী এবং মমিনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুলতানা আক্তার কল্পনার স্বামী জেলা পরিষদের প্রকৌশলী ফজলার রহমান মূল পরিকল্পনাকারী। তার মানে হিন্দুদেরকে নিঃশ্চিহ্ন করার জন্য সকল রাজনৈতিক দলের প্রান্তিক দুষ্কৃতিকারী নেতারা ঐক্যমত। বিএনপি জামাতের হিন্দুদের থেকে তেমন কোন প্রত্যাশা নেই কিন্তু আওয়ামী লীগ দুই দিক থেকেই লাভবান হতে চায়।একটা ডায়লগ প্রায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে দেশে থাকলে ভোট না থাকলে জমি! অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগের যে কোন দুর্যোগের মত হিন্দু সম্প্রদায়েরও শেষ আশা ও ভরসার স্থল মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু তনয়া জন নেত্রী শেখা হাসিনা! রংপুরের ঠাকুর পারার ঘটনার পর এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবে ভিসি প্রফেসর ডক্টর দূর্গা দাস ভট্টাচার্য। তিনি অত্যান্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলছিলেন “মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখা হাসিনা সকল সম্প্রদায়ের বিষোয়ে অত্যান্ত মানবিক, হয়ত বা কোন কারণে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে তাঁর কাছে সঠিক তথ্য উপাত্ত যাচ্ছে না। সরকারের ভিতরে থেকেই হয়ত কেউ আওয়ামী লীগ কে বিপদে ফেলতে এই গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।” আমি দুর্গাদাস স্যারেকে বলেছিলাম এটা আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে উনি যানেন না, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছিনা, কারণ বৃহত রাষ্ট্র ভারতে পররাষ্ট্র মন্ত্রী রংপুরের ঠাকুর পাড়ার ঘটনার বিস্তারিত জানেন এবং উনি নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করছেন, রাষ্ট্রিয় গনমাধ্যম ছাড়াও সামাজিক মাধ্যম এখন যে কোন বিষয়ে সত্য উদঘাটনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে, সরকারের নিজেস্ব গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে, যারা সর্বদা সঠক তথ্যা সরকার কে নিয়মিত জানাতে ততপর। তাই বুঝে উঠিছিনা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী এটা কি করছেন, স্পষ্টত কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না, বরং তাঁর দলের নেতা কর্মীদের কার্যক্রম এবং এ বিষয়ে উনার ভূমেকার জন্য সারা বিশ্বের কাছে সমাদৃত “মাদার অব হিউমেনিটি” বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দুদের কাছে “মাদার অব ইউমিলিটি” করে দিচ্ছে। এটা তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজ, তাঁর দল কিংবা হিন্দু সম্প্রদায় কারো জন্যই শুভকর নয়।

আওয়ামী লীগ দশকের পর দশক ক্ষমতায় থাকুক, হিন্দুদের কোনও সমস্যা নেই, কিন্তু হিন্দুদের সুরক্ষা দিতে হবে, সমর্থন লাভের জন্য ক্ষমতার অংশিদারিত্ব দিতে হবে। প্রতিটি হিন্দু নির্যাতনের ঘটনার পরই বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট হিন্দুদের কে ঐক্যবদ্ধ করে তার প্রতিবাদ জানাতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু এইবারের প্রতিবাদ ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সারা দেশে হিন্দু মহাজোটের নেতৃত্বে প্রায় ৫৮ টি জেলা সদরে একযোগে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। প্রায় এক দশকের অধিক সময় ধরে কাজ করা এই সংগঠনটিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য অনেক ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্ত মিথ্যাকে পরাস্ত করে সময়ের প্রয়জনে, অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই সংগঠনটি সাধারণ হিন্দুদের মনে স্থান করে নিয়েছে এবং তাদের ব্যপক সম্পৃক্ততা হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্মগত অধিকার আদায়ের অন্দোলন কে আরো সুদৃঢ় করবে।

সামনে নির্বাচন, নাসির নগর কিংবা রংপুরের ঠাকুর পাড়ার মত আরো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা আছে, কারণ হিন্দু সম্প্রদায়ের সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রন নেই কিংবা সদিচ্ছা নেই। এখন আমরা একটি হিসাব দেখাতে চাই এখনো বাংলাদেশের অর্ধশতকেরও অধিক সংসদীয় আসনের মূল নিয়ন্ত্রকারী ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট।সুষ্ঠু নির্বাচন যদি হয় এই ভোট যেই দিকে পরবে তারাই এই আসন গুলো পায়, এবং সরকার গঠন করতে পারে। প্রায় ৫ শতাংশ ভোট নিয়ে জাতীয় পার্টি যদি ক্ষমতার ক্রীড়নক হতে পারে, পয়েণ্ট সামথিং পারসেন্ট সমর্থক নিয়ে যদি, কমরেড মেনন, ইনু, দিলীপ মহোদয়েরা ক্ষমতার মান নির্ণায়ক হতে পারে তাহলে ১২% ভোট নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায় কেন পুড়ে পুড়ে মার খাবে!!! সময় এসেছে হিসেব করার। হিন্দু মহাজোট সমস্ত হিন্দুদেরকে নিয়ে ঐক্যের ডাক দিয়েছে। এ নিয়েও অনেকে অনেক বিতর্ক তুলেন বা তুলবেন, বলেবেন হিন্দু মহাজোট ভারতের সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করছে। আমাদের স্পষ্ট কথা ভাই, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা আমাদের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পূর্বে যারা তাঁকে সতর্ক করেছিলেন, সব দুর্যোগে যারা সব থেকে কাছের বন্ধু, ২০১৪ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের সরকার গঠনের জন্য যে দেশ বিশ্বের সকল দেশকে উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ কে সমর্থন করেছিল এবং ক্ষমতা গ্রহনে সহযোগিতা করেছিলে, যাদের সমর্থন পাওয়ার জন্য বিএনপি মরিয়া হয়ে বিভিন্ন ভাবে লবিং করছে, যে দেশের সরকার হিন্দু জাতী গোষ্ঠির প্রতি শানুভূতিশীল তাদের সমর্থন না নিয়ে কি পাকিস্থান, সৌদি আরবের সমর্থন লাভ করবে! আগামী নির্বাচনের পূর্বে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে নিয়ে সুস্পষ্ট ঘোষনা দিতে হবে। যারা হিন্দু নির্যাতনের সাথে সম্পৃক্ত এবং উস্কানী দাতা তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করে উপযুক্ত সাজা প্রদান করতে হবে, অতীতে হিন্দু নির্যাতনের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর ঘটবেনা তার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, হিন্দু সম্প্রদায় থেকে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন, কিংবা পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থায় তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। যে রাজনৈতিক দল এই দাবী গুলোর সাথে একমত হয়ে কাজ করার নির্বাচনী মেনুফেস্টিতে লিখিত অঙ্গীকার প্রদান করবে বাংলাদেশের হিন্দু জাতীগোষ্ঠি তাদেরকেই মূল্যবান ভোট প্রদান করবে, কোনও বৃহত রাজনৈতিক দল যদি হিন্দুজাতী গোষ্ঠির এই যৌক্তিক দাবীকে গুরুত্ব না দেয় তাহলে আগামী নির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায় ভোটপ্রদান থেকে বিরত থেকে সমমনা সকলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিবে।

প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদগণের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিষয়ে শুভ বুদ্ধির উদয় হবে, গণতন্ত্রকে সুসংহত করার জন্য, রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি নাগরিককে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে আমাদের যৌক্তিক দাবীকে সমর্থন করবে এবং “সর্প হইয়া ধংশন কইরা ওঝা হইয়া ঝারার” দ্বৈতনীতি পরিহার করে উন্নত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার সংকল্প নিবে।

 

লেখক-
রিপন দে
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট।

Share

Comments

comments

Shares