প্রচ্ছদ

মোবাইল কোর্ট নিয়ে আতঙ্ক আছে: হাইকোর্ট

04 January 2018, 04:12

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 58 times.

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলের শুনানি শুরু হয়েছে।

বুধবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞার নেতৃত্বাধীন ৫ বিচারপতির বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে যেভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়, তার কড়া সমালোচনা করেছেন আপিল বিভাগ।

আদালত ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলামকে উদ্দেশ করে বলেন, এখন তো মানুষের ইন্টিগ্রিটি (নৈতিকতা) নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি মোবাইল কোর্টের সামনে পড়েছেন কোনো দিন? মোবাইল কোর্ট নিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক আছে। ঘটনাস্থলেই আপনি সাজা দিয়ে দিচ্ছেন অথচ তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিচ্ছেন না।

শুনানি শেষে মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি রেখেছেন আপিল বিভাগ। এ পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত চলবে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। ভ্রাম্যমাণ আদালতের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। রিটের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম। শুনানির শুরুতে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম তার লিখিত শুনানি উপস্থাপন শুরু করেন।

শুনানির একপর্যায়ে আদালত বলেন, ‘আগের মানুষ আর নেই। তখনকার মানুষের একটা চরিত্র ছিল। এখন একটা চাকরির জন্য চারিত্রিক সনদ নিতে গেলেও কোনো কোনো চেয়ারম্যান টাকা নেন। টাকা খেয়ে সালিশে কথা বলেন। আগে তো ২৫-৩০ বছর একজনই চেয়ারম্যান থাকতেন। কোনো অভিযোগ শোনা যেত না। এখন মানুষ বাড়তেছে, কিন্তু ম্যান অব কোয়ালিটি কমছে।এ সময় বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বঙ্গমাতা’ কবিতা থেকে উদ্বৃত করে বলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী/ রেখেছো বাঙালি করে, মানুষ করোনি।’

এ সময় ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, এখন তো মানুষের ইন্টিগ্রিটি নষ্ট হয়ে গেছে মিস্টার ইসলাম। আপনি মোবাইল কোর্টের সামনে পড়েছেন কোনো দিন? মোবাইল কোর্ট নিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক আছে। ঘটনাস্থলেই আপনি সাজা দিয়ে দিচ্ছেন অথচ তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিচ্ছেন না। জোর করেও তো স্বীকারোক্তি আদায় করা যায় মিস্টার ইসলাম।

তখন আমীর-উল ইসলাম বলেন, এটা তো ভালো বিষয়। আপনার দর্শন আর আমার দর্শনে পার্থক্য আছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, এটাকে ভালো বলছেন? দণ্ডবিধির এতগুলো ধারা আপিন অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন আবার আপনিই বলছেন, এটা আদালত না প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এটা তো আমাদের বুঝতে হবে। আমাদের বুঝাতে হবে তো। খুবই সেনসেটিভ বিষয়। আমাদের তো রায় লিখতে হবে। একটা লোককে ২ বছরের জেল দিয়ে দিবেন, তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগই দিচ্ছেন না। তার সুযোগটা কোথায়? হ্যাঁ, কিছু কিছু আইন আছে, যেখানে মোবাইল কোর্ট থাকতেই হবে। কিন্তু সাক্ষ্য আইনের সব সিডিউল যদি নিয়ে নেন, তাহলে এটা কী হবে? ব্যারিস্টার আমীরের কাছে এমন প্রশ্ন রেখে আদালত মঙ্গলবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি রাখেন।

পরে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘মোবাইল কোর্টের ব্যাপারে তিনটা পিটিশন ও একটি আপিল আছে। আপিলে আমি আরগুমেন্ট করব। আর পিটিশনগুলোর মধ্যে একটি এম আমীর-উল ইসলাম অ্যাপিয়ার করেছেন। তাকে সরকার বিশেষভাবে নিয়োগ দিয়েছেন।

আরেকটিতে অ্যাপিয়ার করবেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। আমরা তিনজনই আরগুমেন্ট করব। আগামী মঙ্গলবার আবার হবে। এ পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত চলবে।’

ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ‘ভেজাল খাদ্য, বাল্যবিয়ে, মাদক প্রতিরোধসহ নানা অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের প্রয়োজনীয়তা আছে। এ বিষয়টিই আদালতে বলেছি। মঙ্গলবার আবার শুনানি হবে।’

২০১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ভবন নির্মাণ আইনের কয়েকটি ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে আবাসন কোম্পানি এসথেটিক প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান খানকে ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২০ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্তি পান। এরপর ১১ অক্টোবর ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের (মোবাইল কোর্ট অ্যাক্ট ২০০৯) কয়েকটি ধারা ও উপধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন তিনি।

রিটের শুনানি নিয়ে একই বছর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। আদালতের জারি করা রুলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ৫ ধারা এবং ৬(১), ৬(২), ৬(৪), ৭, ৮(১), ৯, ১০, ১১, ১৩, ১৫ ধারা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে এ ধরনের আরও দুটি রিট করা হয়।

তিন রিটে মোট ১৯ আবেদনকারীর শুনানি শেষে ১১ মে রায় ঘোষণা করা হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে এ আদেশ স্থগিত করে আপিল বিভাগের চেম্বার কোর্ট আদালত বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে প্রেরণ করে আদেশ দেন। একই সঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগের রায় প্রকাশ হলে রাষ্ট্রপক্ষকে নিয়মিত আপিল করারও নির্দেশ দেয়া হয়।

 

সৌজন্যে: যুগান্তর।

Share

Comments

comments

Shares