প্রচ্ছদ

একজন প্রবাসী বাবার চোখের জল

09 January 2018, 16:42

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 42 times.

সঞ্জয় ঘোষ, দুবাই হতেঃ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম জমির সাহেবের। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের দায়িত্ব পড়েছে উনার উপরবাবা মারা যাওয়ার কারণে। উনি অনেক কষ্ট করে ঘর চালাচ্ছিলেন। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য ক্ষেতের জমি আর ছোট একটা বাড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সেই জমিতে ধান চাষ  আর মৌসুম বুঝে বিভিন্ন ধরনের ছোট ব্যাবসা করে পরিবার চালাতেন। পরিবারে মা আর তিন বোন ছিলেন। ভাই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। অনেক কষ্টে পরিবার চালাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে বোনরা ও বড় হচ্ছে। উনার মাথায় রাজ্যের চিন্তা। কী করবেন কিছুই বুঝে উঠেতে পারছেন না। এভাবেই চলছিল উনার দিন। একদিন দেখা হলো একজন প্রবাসীর সাথে। কথায় কথায় ওই প্রবাসী বললেন একটা ভিসা আছে। দাম ৩ লক্ষ টাকা। তখন জমির  সাহেব মহা চিন্তায় পড়লেন। এতো টাকা উনি কোথায় পাবেন !! আত্মীয় স্বজন যারা আছেন তাঁদের অবস্থাও ভালোনা। উনি সিদ্ধান্ত নিলেন ক্ষেতের জমি বিক্রি করে উনি বিদেশ যাবেন। ক্ষেতের জমি বিক্রি করে যে টাকা  পেলেন  তাতেও ভিসার টাকা হলোনা। উনি উনার থাকার শেষ সম্বল বাড়ি টা বন্দক রেখে দিলেন। ২০/২১ বছর বয়সে পাড়ি জমালেন প্রবাসে। যেভাবে উনি চিন্তা করেছিলেন হলো তার উল্টা। এ তো নামে বিদেশ। মরুভূমি তে কাজ করছেন। অনেক কষ্টে আর পরিবার এর কথা চিন্তা করে এবং সব কিছু বিক্রি করে এসেছেন প্রবাসে। কিভাবে আবার চলে যাবেন দেশে !!

অনেক কষ্ট সহ্য করেও থেকে গেলেন। কয়েক বছর পর ও উনি কিছুই করতে পারলেন না। একদিন কাজ থেকে পালিয়ে গেলেন অন্য কোন কাজের আশায়। একজন পরিচিত লোকের মাধ্যমে কাজ পেলেন একটা কন্সট্রাকশন কোম্পানীতে। কাজ কষ্ট হলেও বেতন খারাপ না। কাজ করে যাচ্ছিলেন ওই কোম্পানীতে।  উনি এভাবে আরো তিন বছর পর বোন ২ জন এর বিয়ে দিলেন। বোনের  বিয়ের পর থাকলেন আরো ২ বছর। প্রবাস জীবনের ৯ বছর পর চিন্তা করলেন দেশে যাবেন। মা কে দেখা হয়নি ৯ বছর হলো। গেলেন দেশে। এর মধ্যে ছোট বোনের বিয়ে  দিয়ে  দিলেন। আবার দেশ থেকে প্রবাসে। চোখ এ অনেক স্বপ্ন। ফিরে এসে কাজ করতে লাগলেন সাথে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন এর চেষ্টা। বন্দক রাখা বাড়ি ছাড়িয়ে নিলেন। ২ বছর পর গেলেন আবার দেশে। আত্মীয় স্বজনদের এবং মায়ের পছন্দে বিয়ে করলেন। ৫ মাস দেশে থেকে আবার প্রবাসে পাড়ি। কাজ করতে লাগলেন। দেশের টান আর টাকার অভাব সব মিলিয়ে নিজেকে মানিয়ে নিলেন। তার মধ্যে উনার পরিবারে নতুন সদস্য। ছেলের বাবা হলেন জমির সাহেব। আনন্দের সীমা নেই উনার মনে। এভাবে চলতে লাগলো। ২ বছর পর গেলেন দেশে। বাচ্চা কে প্রথম দেখার আবেগ উনি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিলেন না। আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম উনার চোখে পানি। আবার বলতে লাগলেন। ছেলে কে নিয়ে কত আনন্দ আর ঘুরে বেড়ানো। ছেলের জন্য কত ধরনের খেলনা কাপড় সব নিলেন। দেশে থেকেও কিনলেন অনেক। কিন্তু আনন্দ বেশী দিন থাকলো না। আবার উনাকে ফিরে যেতে হবে টাকার মেশিন নামক প্রবাস এ।

অনেক কষ্টে উনি চলে গেলেন প্রবাসে। চোখে নানা স্বপ্ন ছেলে কে নিয়ে। ছেলের বয়স যখন ৬ তখন তাকে স্কুল এ ভর্তি করালেন। উনার স্বপ্ন ছেলে বড় হয়ে চাকুরী করবে। উনার আর অভাব থাকবে না। উনি জীবনে যে কষ্ট করছেন ছেলের গায়ে তা লাগতে দিবেন না। প্রবাসে ফেরার ৫ বছর পরে গেলেন আবার দেশে। ছেলে তখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ছে। থাকলেন কয়েক মাস। নির্দিষ্ট বলতে পারেন নি ঠিক কত মাস ছিলেন। ৩/৪ মাস হবে এমন। ফেরার পর কাজ আর স্বপ্ন নিয়েই চলতে লাগলো উনার জীবন। উনার ঘরে আরেকজন নতুন সদস্য। ছেলের বাবা হলেন আবার। খরচ বেড়েছে তাই কাজ করতে লাগলেন আরো বেশী করে। এভাবেই চলছিল দিন। তারই মধ্যে বললেন বাড়িতে একটা ঘর বানিয়েছেন। মা বউআর ২ ছেলে ঘরে। মাঝে মাঝে ৩ বোন বোন জামাই তাঁদের বাচ্চাদের নিয়ে আসে। ভালোই কাটছিল দিন। কিন্তু বেশিদিন উনি ভালো থাকতে পারলেন না। হটাৎ করে উনার মা মারা গেলেন। অসুখ ছিল না। বয়স ও খুব বেশী ছিল না। এই শোক উনি কেটে উটতে পারেন নি। ওই সময় থেকেই উনার হার্ট এর সমস্যা দেখা দিল।

কিন্তু ভুলেও দেশে যাওয়ার কথা ভাবলেন না। ছেলেদের ভবিষ্যৎ এর কথা চিন্তা করে কাজ করে যাচ্ছিলেন। ছেলেরা ও বড় হচ্ছে। লেখা পড়া করছে। খরচ অনেক। কিন্তু উনার চোখ এ স্বপ্ন একদিন ছেলেরা বড় হবে। ওরা বড় চাকরী করবে। সেই আশা নিয়েই কাটছিল দিন। আবার দেশে গেলেন। অনেক বছর পর। প্রায় ৭ বছর। তখন ছোট ছেলে ক্লাস ২ তে পড়ে। বাবাকে দেখেছে প্রথম বাবা ও দেখেছেন প্রথম। একটা নিস্টুর অনুভূতি। নিজের ছেলে কে দেখেছেন প্রথম যখন ছেলের বয়স ৭। কিন্তু বাস্তবতা এমনই। আত্মীয় স্বজন দের ও খেয়াল রাখছিলেন। কয়েক মাস দেশে থেকে আবার প্রবাসে। নিজের যৌবন কেটে গেছে টাকার মেশিন নামক প্রবাস এ। ছেলেরা ও বড় হতে লাগলো। উনি ৩ বছর পর পর দেশে যেতেন। উনার বড় ছেলে বিএ পাস করে চাকরীর পিছনে লাগলেন। অনেক কস্টে ৪ লাখ টাকার বিনিময় এ বড় ছেলে একটা চাকরী পেয়ে গেল। ছোট ছেলে ও পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। উনার জীবন টা প্রবাসেই কেটে যাচ্ছে। ছোট ছেলে ও এখন চাকুরী করছে। উনার বয়স এখন ৫৭ বছর। এখন ও উনি কাজ করছেন প্রবাসে।

চলে যাবেন কিনা সেটা নিয়ে চিন্তায় আছেন। জানতে চাইলাম যাচ্ছেন না কেন দেশে। উনি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললেন ওই যে কপালে সুখ নাই। ছেলেরা বিয়ে করে বড় ছেলের ঘরে ২ টা নাতী আছে। ছোট ছেলের নতুন সংসার। ছেলেরা থাকে শহর এ। ছেলেরা বলতে গেলে আলাদাই আছে। মাঝে মাঝে মায়ের খবর নেয়। ওরা তাঁদের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত এখন। উনার চোখ এ আবার দেখলাম পানি। উনি এখন কাজ করছেন একটা কন্সট্রাকশন কোম্পানী তে। উনার আসল নাম জানা হয়নি। বাড়ি কই তা ও জানা হয়নি। উনার কথা শুনে আমার প্রশ্ন করার কথা মনেই ছিলনা। আর কখনো উনার সাথে দেখা হবে কিনা তা ও জানা নাই আমার। শুধু উনার স্বপ্ন দেখা টাই আমার মনে বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে। এতো স্বপ্ন উনার কিন্তু সত্য হলো কতটুকু তা উনি নিজে ও জানেন না। আর কত বছর প্রবাসে থাকবেন তা ও উনি জানেন না। কিন্তু একটা উপদেশ দিতে ভূললেন না। বললেন বাবা জীবনে মা বাবার কস্টের কথা ভুলবে না। তুমি প্রবাসে এসেছো। নিজের পরিবার এর সাথে নিজের কথা ও চিন্তা করে চলো। আমাকে প্রশ্ন করলেন আমি বিয়ে করেছি কি না। হ্যাঁ বলার পর বললেন বউ কি তুমার মায়ের সাথে থাকে নাকী তার বাবার বাড়িবললাম আমার মায়ের সাথে আছে ৩ বিয়ের পর থেকেই। আল হামদুলিল্লাহ বলে বললেন তুমার মায়ের দোয়া তুমার সাথে থাকবে। আমি আবার দেখলাম উনার চোখ এ জল। আমি কিছুই প্রশ্ন করতে পারছিলাম না উনার কাছে। শুধু শুনেই যাচ্ছিলাম। হটাত করে বললেন বাবা আমার গাড়ি এসে গেছে। আমি চলে যাচ্ছি। দোয়া করো আমার জন্য। এই বলেই উনি চলে গেলেন। আমি কয়েক বার ওই জায়গায় গিয়ে ও উনাকে আর পাইনি। কোথায় কাজ করছিলেন তা ও আমি জানিনা। রাস্তার পাশে দেখা হয়েছিল। কথা বার্তা হচ্ছিল ওখানেই।

আমি সব কথার মাঝে শুধু উনার চোখ এর জল টাই দেখছিলাম। ভালো থাকুন বাবা। এই বয়স এ কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ আপনার পাশে না থাকলেও ভগবান আছেন আপনার পাশে। আপনার আগামী দিন গুলো আপনার স্বপ্নের মতো হোক এই আশা করছি আমি এক প্রবাসী।

(সত্য ঘটনা। নাম কাল্পনিক। )

Share

Comments

comments

Shares