প্রচ্ছদ

জোর করে তরুণীকে বিয়ে: ডিআইজি মিজানকে প্রত্যাহার

10 January 2018, 09:11

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 80 times.

ডিআইজি পদমর্যাদার এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। সোমবার বিকালে তেজগাঁও হোসেন আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে শীতবস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “এ বিষয় নিয়ে ইন্টারনাল তদন্ত চলছে।” মিজানের বিরুদ্ধে ঢাকার পান্থপথের বাসিন্দা এক নারী অভিযোগ করেছেন, তাকে তুলে নিয়ে জোর করে বিয়ে করে সংসারও করছিলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

ওই নারীর অভিযোগ, প্রায় চার মাস সংসার করার পর ফেইসবুকে স্বামী পরিচয় দিয়ে মিজানের একটি ছবি তোলার পর মিজান তাকে নানাভাবে নির্যাতন শুরু করেন। দুটি ‘মিথ্যা মামলা’ দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে জামিনে তিনি বেরিয়ে  আসেন।

তবে মিজান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ওই নারী একজন প্রতারক। গণমাধ্যমে এই খবরটি আসার পর পুলিশ সপ্তাহের আগে থেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে চলছিল মিজানকে নিয়ে আলোচনা। সোমবার পুলিশ সপ্তাহ শুরু হলে রাজারবাগে সাংবাদিকসহ অনেকেই খুঁজতে থাকেন এই ডিআইজিকে। তবে রাজারবাগের অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊধ্বর্তন সব কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেও দেখা যায়নি অতিরিক্ত কমিশনার মিজানকে। তাকে দেখেছেন, এমন কোনো তথ্য কোনো পুলিশ কর্মকর্তা দিতে পারেননি।

জোর করে বিয়ে ও মিথ্যা মামলায় জেলখাটানোর অভিযোগে অভিযুক্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমানে তাকে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। ৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি)  সহেলী ফেরদৌস গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

একই দিন দুপুরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল পুলিশ সপ্তাহের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের একই কথা জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ডিআইজি মিজানের নানা রকম কথা জানতে পেরেছি। এই বিষয়ে তদন্তের পর জানতে পারব আসলে সে কতটা দোষী। এখন প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ভিত্তিতে ডিআইজি মিজানকে ডিএমপি থেকে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে।’

ডিআইজি মিজানের অভিযোগ তদন্ত করতে কত সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন পুলিশ সপ্তাহ চলছে । দুই-একদিন পর আইজিপি-ডিএমপি কমিশনারের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত কাজ শুরু হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’

সম্প্রতি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই নারী অভিযোগ করেন, গত জুলাই মাসে রাজধানীর পান্থপথের বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন মিজানুর রহমান। এরপর মিজানের বেইলি রোডের বাসায় নিয়ে তিনদিন তাকে আটকে রাখা হয়। আটকে রাখার খবর পেয়ে বগুড়া থেকে তার মা ১৭ জুলাই ঢাকায় আসেন। তখন ৫০ লাখ টাকা কাবিননামায় ওই নারীকে বিয়ে করতে বাধ্য করে মিজানুর রহমান।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বিয়ের পরে একটি ভাড়া বাড়িতে ওই নারীকে নিয়ে একসঙ্গে প্রায় চার মাস বসবাস করেছেন ডিআইজি মিজান। নিজের ফেসবুকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে একটি ছবি শেয়ারের পর ওই নারীর ওপর ক্ষেপে যান মিজানুর রহমান।

পরে বাড়ি ভাঙচুরের একটি মিথ্যা মামলায় তাকে গত ১২ ডিসেম্বর কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর মিথ্যা কাবিননামা তৈরির অভিযোগে ওই নারীর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন ডিআইজি মিজানুর রহমান। এই দুই মামলায় আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসার পরে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেন ওই নারী।

অবশেষে বহুল আলোচিত ডিআইজি মিজানুর রহমানকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনারের পদ থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ সপ্তাহের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

প্রসঙ্গত, ‘তুলে নিয়ে বিয়ে করলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার!’ শিরোনামে ৭ জানুয়ারি যুগান্তরে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ‘এক সংবাদপাঠিকার জীবনও বিষয়ে তুলেছেন ডিআইজি মিজান’ শিরোনামে পরদিন ৮ জানুয়ারি আরও একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করে। জনমনে প্রত্যাশা ছিল- অভিযুক্ত এ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সময়ের ব্যাপার।

এর মধ্যে মঙ্গলবার যুগান্তরে প্রকাশিত হয় ‘অস্ত্রের মুখে সংবাদপাঠিকাকে তুলে নেয়ার সময় জনতার রোষানলে পড়েন’ শিরোনামে আরও একটি তথ্যবহুল রিপোর্ট। ৮ জানুয়ারি থেকে যমুনা টিভিও বিষয়টি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন সম্প্রচার করে। যেখানে তথ্য-প্রমাণ হিসেবে অভিযোগের অনেক কিছু অডিও ও ভিডিওর মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়। এরপরই মঙ্গলবার দুপুরে ডিআইজি মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তটি সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়।

এদিকে সাধারণ মানুষের অনেকে যুগান্তরের কাছে তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, পুরো ঘটনায় নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সেটি যেন সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়। কেউ কেউ বলেন, পুলিশের বাইরে নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত হলে তা আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।

মোদ্দাকথা, তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে দৃষ্টিমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্ত চলাকালে ভিকটিমসহ এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সম্ভাব্য সব সাক্ষীর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারের। সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ মঙ্গলবার সন্ধ্যার বাংলাদেশে যমুনা টিভির সরাসরি সম্প্রচারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এটি তো ভয়াবহ বিষয়। তার ৩০-৩৫ বছরের চাকরিজীবনে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তিনি এমন অভিযোগ পাননি।

তার মতে, পুলিশের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করা যায় না। তিনি মনে করেন, সরকার অবশ্যই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। ইতিমধ্যে সরকারের তরফ থেকেও তেমনটি নিশ্চিত করা হয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে ডিআইজি মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করার খবরটি সাংবাদিকদের জানানোর সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘গণমাধ্যমে আসা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের পর আমরা বুঝতে পারব, সে কতখানি দোষী ও কতটুকু অন্যায় করেছে। তা জানার পর আমরা পরবর্তী অ্যাকশনে যাব। বর্তমানে তাকে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। যাতে তদন্তটা নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখুন এখন পুলিশ সপ্তাহ চলছে। এখানে আইজিপি ও পুলিশ কমিশনারও আছেন। তারা এটার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করবেন। আশা করছি, তদন্ত কমিটি কাল-পরশু থেকে কাজ শুরু করবে।’

শেষ পর্যন্ত তদন্তে পার পেয়ে যাবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান। ব্যক্তির দায় বাহিনী নেবে না। আপনারা জানেন, যে দেশে এমপিরা জেলখানায় আছেন, পুলিশসহ অনেকেই জেলখানায় আছেন সেখানে অপরাধ করে কারও পার পেয়ে যাবার সুযোগ নেই।’

ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত গুরুতর অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- তিনি মরিয়ম আক্তার ইকো নামে আনুমানিক ২৫ বছয় বয়সী এক মেয়েকে জোরপূর্বক তার পান্থপথের বাসা থেকে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে রাজধানীর তিনশ’ ফুট এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে তাকে মারধর করে চোখ বেঁধে রাতে বেইলি রোডের নিজ ফ্ল্যাটে নিয়ে আসেন।

তিন দিন আটকে রাখার পর মেয়ের মাকে সেই ফ্ল্যাটে এনে মেয়েকে ফিরিয়ে দেয়ার পরিবর্তে হত্যার হুমকি দিয়ে ৫০ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে করেন। এরপর মরিয়ম আক্তার ইকোকে নিয়ে লালমাটিয়ার একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে চার মাস সংসার করেন। পরবর্তী সময়ে কাবিননামার কপি তোলার জন্য মেয়ের মা আবেদন করলে এবং ফেসবুকে স্বামী পরিচয় দিয়ে স্ত্রী মরিয়ম আক্তার ইকো ডিআইজি মিজানের ছবি আপলোড করায় মিজান ক্ষেপে যান। এরপর পরপর দুটি মিথ্যা মামলা দিয়ে স্ত্রী ইকোকে কারাগারে পাঠান ডিএমপির ওই অতিরিক্ত কমিশনার। ২১ দিন কারাভোগের পর ১ জানুয়ারি ইকো কাশিমপুর কারাগার থেকে ছাড়া পান।

এদিকে শুধু ইকো নয়, এ রকম বহু মেয়েকে তিনি ফাঁদে ফেলে এবং ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে হয়রানি ও নানাভাবে নির্যাতন করেন। দৈনিক যুগান্তরের এ অনুসন্ধানের সূত্র ধরে বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের জনৈক সংবাদপাঠিকাকে হেনস্তা করার বিষয়টি সামনে চলে আসে। জানা যায়, ইকোর মতো ওই সংবাদপাঠিকাকেও তিনি জোর করে গাড়িতে তুলে নির্যাতন করেন।

 

তথ্যসুত্র-যুগান্তর,প্রিয়। 

Share

Comments

comments

Shares