প্রচ্ছদ

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী লুপ্তপ্রায় ধামাইল নৃত্যগীত…

20 January 2018, 02:38

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 215 times.

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী লুপ্তপ্রায় ধামাইল নৃত্যগীত পূনর্জাগরনে নিরলসভাবে

কাজকরে যাচ্ছেন শ্রীমঙ্গলের রামকৃষ্ণ সরকার-

সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল নৃত্যগীত আবহমান গ্রামবাংলার একটি লুপ্তপ্রায় প্রাচীন লোকজসংস্কৃতি, একসময় বিয়ে-অধিবাস পূজাপার্বণ সহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গ্রামীণ মহিলারা সম্মিলিতভাবে হাতে তালি দিয়ে চক্রাকারে ঘুরেঘুরে গানের সাথে নৃত্য, এই নৃত্যকেই ঐতিহ্যবাহী ধামাইল নৃত্যগীত বলা হয়ে থাকে।

বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির যুগে নৃত্য আছে, গান আছে, কিন্তু ধামাইল নৃত্যগীত খুব একটা দেখা যায়না, নাচ বা নৃত্যের অন্যরকম একটি লোকজধারা এই ধামাইলনৃত্য, বিশেষ করে গ্রামের মানুষের কাছে ধামাইল একটি জনপ্রিয় নৃত্য, যদিও এখন দেখাযায় বিভিন্ন ধরনের আধুনিক নৃত্য, উপজাতীয়দের মধ্যে তাদের আলাদা নৃত্যের প্রচলন এখনও আছে। কিন্তু বাঙ্গালীদের ঐতিহ্যবাহী ধামাইলনৃত্য আজ অনেকটা বিলুপ্তির পথে প্রায়। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রাচীন কৃষ্টি-কালচার গুলোও আমাদের মাঝ থেকে দিনদিন হারিয়ে যেতে বসেছে।আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে ।

এসবে আমাদের মনে একটুও নাড়া দেয়না, যদিও আমরা পুরানো দিনের গান কিংবা গল্পশুনি, তাহলে তন্ময় হয়ে পরি খানিকের জন্য, এ যেন এক অন্যরকম মোহ তাও কেটে যায় মুহুর্তেই, ফলে আমাদের পাওয়ার চেয়ে হারানোর পরিমানটা যে অনেক বেশী তা আদৌ কেউ ভাবেননা। সেই প্রাচীন ও লুপ্তপ্রায় ধামাইলনৃত্যকে বর্তমান সময়োপযোগী করে তোলার মাধ্যমে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন রামকৃষ্ণ সরকার, এরই ধারাবাহিকতায় ধামাইল নৃত্যগীত পূনর্জাগরনের একজন বিপ্লবী সৈনিক বলা যায় তাকে।

রামকৃষ্ণ সরকার অতিশিক্ষিত বা বিত্তবান ঘরের সন্তান নয়, তবে তার মধ্যে যে একটি দূরদর্শী চিন্তা চেতনা আছে, তারই প্রমাণ করেছে সে ধামাইলনৃত্যের জন্য নিরলসভাবে কাজকরে, সাথে সিলেট অঞ্চলের লুপ্তপ্রায় লোকজগান যেমন রাধারমণ, হাছনরাজা, শাহ আব্দুল করিম ও দ্বীন ভবানন্দসহ সিলেট অঞ্চলের অন্যান্য লোককবিদের গান ইত্যাদি, যেসব লোকগীতের মৃত্যুনেই, অথচ এসব গীতের চর্চাকরা হচ্ছেনা, এ বিষয়ে রামকৃষ্ণ সরকারের ভূূমিকা লক্ষণীয়।

আবহমান গ্রামবাংলার তথা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল নৃত্যগীতের একজন সংগঠক ও সংগ্রাহক রামকৃষ্ণ সরকার। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার রুস্তমপুর গ্রামে তার জন্ম, ছোটবেলা থেকেই সাদাসিদে চলাফেরা করে আসলেও তার মধ্যে একটা দার্শনিক মনোভাব পরিলক্ষিত হতো, আর সেই দার্শনিকতাকে অনেকেই নির্বোধ বোকা বলে মনে করতো । লুপ্তপ্রায় ধামাইল নৃত্যগীতের বিষয়ে আলাপকালে মূখে পান চিবুতে চিবুতে রামকৃষ্ণ জানান, আমি সেই ছোটবেলা থেকেই ধামাইল নৃত্যগীতের প্রতি আকৃষ্ট ছিলাম, সেই সময় নিজগ্রামে বা আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে বিয়ের আসরে ধামাইল নৃত্যগীত দেখতে যেতাম,তখন বিভিন্ন বিয়ের আসরে ৮-১০জন বা ততোধিক নারীদের একত্রে গোল হয়ে হাতেতালি দিয়ে আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে পরিবেশিত ছন্দময় ধামাইলনৃত্য আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষন করতো, সেই ধামাইল নৃত্যগীত দেখে দেখেই আমি এই নৃত্যগীতের নেশায় মজে যাই, সেই নেশা আমার আজও যায়নি। এই নৃত্যগীত নারীকন্ঠে গীতো হয় বলে একে অনেকে নারীসঙ্গীতও বলে থাকেন। এই নৃত্যগীতের মধ্যে একাধারে ফুটে উঠে নারী মনের সুখ-দু:খ, বিরহবিচ্ছেদসহ আনন্দবেদনার বাস্তবচিত্র। কিন্তু বর্তমানে কালের বিবর্তনে এই ধামাইল নৃত্যগীত প্রায হারিয়ে যেতে বসেছে, আগেরমত এই নৃত্যগীতের চর্চা এখন আর দেখা বা শুনাযায়না। একসময় সিলেট অঞ্চলের ধামাইলগানে ‘ভাইবে রাধারমণ বলে’ নামপদ এতদাঞ্চলের মানুষের মূখে মূখে প্রচলিত ছিল,তবে গ্রামাঞ্চলে এখনো এই নৃত্যের কিছু কিছু প্রচলন থাকলেও শহরাঞ্চলে এর প্রচলন খুবই কম।

রামকৃষ্ণ আরো বলেন, বিগত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই ধামাইলগান ও নৃত্যের বিভিন্ন ভঙ্গিমা ও ধরনের খোঁজে ঘুরে বেরিয়েছি সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে, মিশেছি নবিন প্রবীণ সহ গ্রামীণ শিল্পীবৃন্দের সাথে, তাদের সাথে একাত্ম হয়ে সংগ্রহ করেছি ধামাইলগান নাচেরধরন ও ভঙ্গিমা,গ্রামে গ্রামে গিয়ে গ্রামীণ ধামাইলশিল্পীদের খোঁজে বের করে তাদেরকে উৎসাহ অনুপ্রেরণার পাশাপাশি ধামাইলনাচের বিভিন্ন ভঙ্গিমা ও ধরনের দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছি, এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৪১২ বাংলার ১লা বৈশাখ প্রতিষ্ঠা করি সিলেট বিভাগের শ্রীমঙ্গলে সর্বপ্রথম ধামাইল সংগঠন “নবনাগরী ধামাইল সংঘ” এই সংগঠনের মাধ্যমে ধামাইলের প্রচার প্রসার ও উন্নয়নের লক্ষে ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুইশতাধিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠান করেছি।

সম্প্রতি এই ধামাইল নৃত্যগীতের সংরক্ষণ উন্নয়ন ও প্রসারের লক্ষে রামকৃষ্ণ সরকারের আহবানে সাড়াদিয়ে দেশজ সংস্কৃতির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্টান ‘বেঙ্গল ফাউন্ডেশন’ এর সহযোগিতায় এবং সিলেট বিভাগ ধামাইলনৃত্য উন্নয়ন পরিষদের আয়োজনে শ্রীমঙ্গলে হয়ে গেলো তিনদিন ব্যাপী সিলেট বিভাগীয় ধামাইল প্রশিক্ষণ কর্মশালা-২০১৭, এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় সাড়াদিয়ে আগ্রহী ও উৎসাহিত হয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন স্কুলকলেজের ছাত্রী ও গ্রামীণ মহিলা ধামাইল শিল্পীসহ ৮৫ জন প্রশিক্ষণার্থী এই কর্মশালায় অংশগ্রহন সহ সিলেট ও সুনামগঞ্জ থেকে ৪৫ জন নারী ধামাইলশিল্পী নিয়ে গঠিত চারটি ধামাইল সংগঠনও কর্মশালায় অংশ নেয়, এতে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নতুনভাবে ধামাইলের জাগরনসহ শিল্পীদের আগ্রহ ও উৎসাহ বাড়ছে, ঐতিহ্যবাহী লুপ্তপ্রায় এই ধামাইল সংস্কৃতির জাগরন ও উৎসাহ অনুপ্রেরনা অব্যাহত রাখতে ‘বেঙ্গল ফাউন্ডেশন’এর পাশাপাশি অন্যান্য সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহ সংস্কৃতি অনুরাগী বিত্তবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করি।

Share

Comments

comments

Shares