প্রচ্ছদ

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের জীবনের কিছু মজার ঘটনা ও সৃষ্টি…

22 January 2018, 16:10

বহ্নি চক্রবর্তী
This post has been seen 103 times.

বহ্নি চক্রবর্তীঃ একবার নজরুল গেছেন সিরাজগঞ্জে, আসাদউদ্দৌলা সিরাজীর বাসায়। খাওয়া দাওয়ার পর সবাইকে দই দেয়া হলো । কিন্তু সে দই আবার ছিল টক।  হয়তো দই একটু আগে ভাগেই নিয়ে আসাতে এরকম হয়েছিল, নষ্ট হয়ে টক হয়ে গেছে । আর তা খেয়ে নজরুল কী বললেন জানো ? আসাদ উদ্দৌলার দিকে তাকিয়ে চোখে-মুখে অদ্ভূত ভঙ্গি করে বললেন- ‘তুমি কি এই দই তেতুঁল গাছ থেকে পেড়ে নিয়ে এলে নাকি ?’ আর তা শুনে সবাই তো হেসেই খুন !

ছোটদের জন্য পাঠ্যবই লিখতেন আলী আকবর সাহেব । একদিন নজরুল ইসলামকে একটি পান্ডুলিপি দেখিয়ে মতামত চাইলেন। পুরো পান্ডুলিপিটি পড়ে নজরুল বললেন, আপনার পান্ডুলিপির ছড়াগুলো ছোটদের উপযোগী হয়নি । যদি বলেন তো আমি একটা ছড়া লিখে দিতে পারি । সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুরোধ করলেন নজরুলকে একটি ছড়া লিখে দেয়ার জন্য । নজরুল ইসলামও দু’খিলি পান মুখে পুরে লিখলেন সেই বিখ্যাত ‘লিচু চোর’ ‘বাবুদের তালপুকুরে/ হাবুদের ডালকুকুরে/ সেকি ব্যস করলো তাড়া/ বলি, থাম-একটু দাঁড়া ।…’

পুতুলের মতো ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে অঞ্জলি । একদিন নজরুল বারান্দায় বসে আছেন ।  হঠাৎ তার চোখ পড়লো অঞ্জলির ওপর । নজরুল দেখলেন, একটা পেয়ারা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে চোখ-ঠোঁট উল্টিয়ে, হাত-পা নেড়ে অঞ্জলি যেনো কার সঙ্গে কথা বলছে । সেই কথা আর শেষই হতে চায় না । নজরুল ভাবলেন, নিশ্চয়ই কেউ পেয়ারা গাছে উঠেছে । তার কাছে কাকুতি-মিনতি করে অঞ্জলি পেয়ারা চাইছে, কিন্তু গাছের ওপর যে, সে পেয়ারা দিচ্ছে না । নজরুল তো ছোটদের খুব ভালোবাসতেন । তিনি ভাবলেন, অঞ্জলির হয়ে পেয়ারা চাইবেন । ছেলেটা দেয় তো ভালো । না দিলে নিজেই পেয়ারা পেড়ে দেবেন । মজার ব্যাপার হলো, অঞ্জলির সামনে গিয়ে কবি নজরুল গাছের ওপর কাউকেই দেখতে পেলেন না । তবে অঞ্জলি কথা বলছিলো কার সঙ্গে ? নজরুল তখন অঞ্জলিকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কার সাথে কথা বলছিলে ? অঞ্জলি বললো, কাকাবাবু ! ওই দেখো দুষ্টু কাঠবেড়ালী । রোজ রোজ দুষ্টুটা পেয়ারা খেয়ে পালিয়ে যায় । আমাকে একটাও দেয় না । কাঠবেড়ালীর সঙ্গে অঞ্জলির এই মান অভিমানের ঘটনাটি নজরুলকে এতোটাই চমৎকৃত করলো যে, এ ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য লিখলেন ‘খুকী ও কাঠবেড়ালী’ নামের সেই কবিতা । ‘কাঠবেড়ালী! কাঠবেড়ালী ! পেয়ারা তুমি খাও?/ গুড়-মুড়ি খাও! দুধ-ভাত খাও? বাতাবি লেবু ? লাউ ?…’

শিল্পী আব্বাসউদ্দিন একদিন অনেক খোঁজাখুঁজি করে নজরুলকে না পেয়ে সকালে তার বাসায় গেলেন । বাসায় গিয়ে দেখলেন নজরুল গভীর মনোযোগ দিয়ে কি যেন লিখছেন । নজরুল ইশারায় আব্বাসউদ্দিনকে বসতে বললেন । আব্বাস উদ্দিন অনেকক্ষণ বসে থাকার পর জোহরের নামাজের সময় হলে তিনি উসখুস করতে লাগলেন । নজরুল বললেন ‘কি তাড়া আছে, যেতে হবে ?’ আব্বাসউদ্দিন বললেন “ঠিক তাড়া নেই, তবে আমার জোহরের নামাজ পড়তে হবে । আর এসেছি একটা ইসলামি গজল নেবার জন্য । নামাজ পড়ার কথা শুনে নজরুল তাড়াতাড়ি একটি পরিস্কার চাদর তার ঘরের আলমারি থেকে বের করে বিছিয়ে দিলেন । জোহেরর নামাজ শেষ করার সাথে সাথে নজরুল আব্বাস উদ্দিনের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন ‘এই নাও তোমার গজল’ । আব্বাস উদ্দিন বিস্ময়ের সাথে দেখলেন তার নামাজ পড়তে যে সময় লেগেছে ঠিক সেই সময়ের মধ্যে নজরুল সম্পুর্ণ একটি নতুন গজল লিখে ফেলেছেন । সেটিই হচ্ছে বিখ্যাত সেই গজল ‘হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ/ দিলাম তোমার চরণ তলে হৃদয় জায়নামাজ ।

কাজী নজরুল ইসলাম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ২৪শে মে,১৮৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন । বিদ্রোহী কবি নামেই বেশি পরিচিত তিনি । তাঁর কবিতা, গান, গল্প, নাটক, উপন্যাস আমাদের সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ । শিশুদের জন্যও তিনি অনেক গান, কবিতা, ছড়া ও নাটক লিখেছেন । তিনি ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন ।

(সংগৃহীত)

Share

Comments

comments

Shares