প্রচ্ছদ


ডিজিটাল বাংলাদেশ, ডিজিটাল রসরাজ!!

05 November 2016, 20:34

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 845 times.

রসরাজ দাশ

রসরাজ দাশ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে, রিতা রয় মিঠুঃ ছবিতে রসরাজ দাশ, একজন জেলে। জেলে হচ্ছে যে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে। মাছ ধরতে হলে লেখাপড়া নাজানলেও চলে, তবে রসরাজ নিরক্ষর নয়। মালাউনের ঘরে কেউ নিরক্ষর থাকেনা, তবে সে আমার মত বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স মাস্টার্স বিএড ডিগ্রী প্রাপ্তও নয়।

ফেসবুক নিয়ে আজকাল খুব কথা হচ্ছে, ফেসবুক হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুত সময়ে বিশ্বের যে কোন প্রান্তে থাকা যে কারো সাথে যোগাযোগ করার সফল ও কার্যকরী মাধ্যম। খুব খুব খুবই জনপ্রিয় ‘ফেসবুক’ ‘আবিষ্কৃত’ হয়েছে আমেরিকায়, ফেসবুক আবিষ্কার করেছেন আমেরিকান কমপিউটার প্রোগ্রামার মার্ক জুকারবার্গ।
খুব বেশী সময় আগের কথাও নয়, ১২/১৩ বছর আগে ফেসবুকের নাম একটু আধটু শোনা যেত, গত ৬/৭ বছরে ফেসবুক সারা বিশ্ব মাতিয়ে ফেলেছে। জুকারবার্গের বর্তমান বয়স ৩২ বছর, মার্ক জুকারবার্গ যখন হার্ভার্ড ইউনিভারসিটিতে পড়েন, তখন পরীক্ষামূলকভাবে নিজেদের ডর্মের সীমানার মধ্যে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য ফেসবুক নেটওয়ার্ক প্রোগ্রাম তৈরী করেন, এরপর বাকীটুকু ইতিহাস।

জুকারবার্গ কল্পনাও করতে পারেনি, তার এই মজার প্রোগ্রাম একদিন বিশ্ব মাতাবে, মাতাবে আমেরিকার উলটো প্রান্তে থাকা ছোট্ট সবুজ দেশ বাংলাদেশকে। বাংলাদেশটা একদিন নিয়ন্ত্রিত হবে জুকারবার্গ আবিষ্কৃত ফেসবুক দ্বারা।

আমার স্বামীও একজন বিজ্ঞানমনস্ক পন্ডিত, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, বিজ্ঞানের মানুষ কিন্তু বিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় আবিষ্কার ফেসবুক ব্যবহার করতে জানেননা। আমি অবশ্য ফেসবুক ব্যবহার করতে শিখেছি, ফেসবুকে আছি ৫/৬ বছর হয়ে গেলো। আমিও বিজ্ঞানেরই ছাত্রী, কিন্তু গবেট ধরণের ছাত্রী। কারণ এত বছর ফেসবুক ব্যবহার করেও ফেসবুকে পন্ডিত হয়ে উঠতে পারিনি। ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখা ছাড়া আর কিছুই পারিনা।

ফেসবুকে পন্ডিত বাংলাদেশের আকাশ থেকে পাতাল পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ। সাধে কি বাংলাদেশের মন্ত্রী মিনিস্টাররা সব সময় বলেন, বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়ে গেছে!, মানে সেই চিরচেনা নরম কোমল বাংলাদেশ এখন হাই টেক বাংলাদেশ হয়ে গেছে। আগে বিশ্বাস করতামনা যে বাংলাদেশ সত্যিই ডিজিটাল হয়ে গেছে। ৬/৭ দিন আগে জেলে রসরাজ দাশের পৃথিবী কাঁপানো কান্ডকারখানা দেখে নিশ্চিত হলাম, বাংলাদেশ সত্যিই ডিজিটাল হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ, অশিক্ষিত থেকে উচ্চশিক্ষিত, পুরুষ নারী, যুবা শিশু সকলেই ফেসবুকে অভিজ্ঞ । তাদের অধিকাংশই ফেসবুকের কারিগরি নিয়ে বেশ ব্যস্ত থাকে। বিশেষ একটি গোষ্ঠিই তৈরী হয়েছে ফেসবুককে নানা আঙ্গিকে, নানা ভঙ্গিমায় ব্যবহার করার লক্ষ্যে। বাংলাদেশীদের কাছে ‘স্ক্রিনশট’ বলে একটা কায়দা জানা আছে। আমি হয়তো একটা কিছু লিখলাম নিজের ওয়ালে, লিখাটা পাঁচ মিনিট পরেই আমি ডিলিট করে দিলাম। কিন্তু এক মিনিট পরেই আমার লেখাটি দেখতে পাব অন্য সবার ওয়ালে । কি ব্যাপার? আমি যখন লেখাটি পোস্ট করেছিলাম, স্মার্ট বাংলাদেশী কেউ একজন তার ছবি তুলে নিয়েছে, সেই ছবিই সে এর সাথে তার সাথে শেয়ার করে মজা কুড়াচ্ছে। আমি আমেরিকায় থেকেও ‘স্ক্রিন শট’ কি করে নিতে হয় জানিনা। একজন বাংলাদেশী হিসেবে এ আমার চরম অক্ষমতা।

শুধু কি স্ক্রিনশট ? বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা আরেকটা জিনিস জানে, ফটোশপ। ‘ফটোশপ’ কি জিনিস এটাও আগে জানতাম না। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ভূমিষ্ঠ হয়েই নাকি ‘স্ক্রিনশট, ফটোশপ’ শিখে ফেলে। আমি বিজ্ঞান পড়েও গর্দভ রয়ে গেলাম, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা জন্মেই ‘জুকারবার্গ’ হয়ে যায়। অনেক পরে বুঝেছি, ফটোশপ হচ্ছে, অবিশ্বাস্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা। একটা উদাহরণ দেই, ধরুন আপনার খুব শখ হলো, মাধুরী দীক্ষিতের সাথে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিমায় ছবি তোলার। বাংলাদেশের যে কোন শিশুকে বলুন, সে ফেসবুকে “মাধুরীকে আপনি চুমু খাচ্ছেন, আপনার চুমুতে মাধুরী গলে গলে পড়ছে” ছবি বানিয়ে দিবে। এটাকেই বলে ফটোশপ।

বিশ্বাস হয়না? বিশ্বাস না হলে আপনি এখনও অ্যানালগ যুগে আছেন, ডিজিটাল শিখতে বাংলাদেশে যান, বাংলাদেশে নিরক্ষরও ডিজিটাল জ্ঞান সম্পন্ন, নিরক্ষরও ফেসবুকে স্ক্রিনশট জানে, ‘ফটোশপ’ জানে। নীচের ছবিতে গালে খোঁচা দাড়ি লুঙ্গি পরিহিত লোকটাকে দেখছেন, ওর নাম রসরাজ দাশ। খুব বেশী লেখাপড়া জানে বলে মনে হয়না, অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন জেলে রসরাজ দাশ বাংলা বানান শুদ্ধ করে লিখতে পারেনা। সবাই ফেসবুক করে, সেও ফেসবুক খুলেছে। ফেসবুক খুলেই সেও নাকি সবার আগে স্ক্রিনশট, ‘ফটোশপ’ করার কারিগরি শিখে ফেলেছে!!

** খেয়াল করুন, জেলে রসরাজ দাশ বাংলা বানান শুদ্ধ করে লিখতে পারেনা, কিন্তু সে স্ক্রিনশট জানে, ফটোশপ জানে।** বিশ্বাস আপনাকে করতেই হবে এই কথা, বিশ্বাস নাকরে কোথাও যেতে পারবেন না। সে নাকি পবিত্র কাবাশরীফের উপর শিব ঠাকুরের মূর্তি বসিয়ে নিজের ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছ!!!! এমনটাই শুনেছি, নিজের চোখে অবশ্য দেখিনি। আমি কেন, কেউই দেখেনি রসরাজকে এমন ‘বেসম্ভব কান্ড’ করতে। এই কান্ড ঘটবার সাথে সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বারুদের স্তূপে দেশলাইয়ের কাঠি পড়েছে।

শুভাকাংক্ষী বন্ধুরা ডেকে বলেছে, ” ওরে জাউলার বেটা জাউলা, করছস কি? পবিত্র কাবাশরীফের উপর তোগো শিবের ছবি লাগাইছস ক্যান?” জেলে রসরাজ তখন হয়তো মাছ ধরা, মাছের হিসেব নিয়ে ব্যস্ত ছিল। ঘটনার আগাও বুঝেনি মাথাও বুঝেনি হয়তো। সে তড়িঘড়ি করে ফেসবুকেই ভুল বানানেই “আমি জানিনা কে এই কাজ করেছে, আমি করিনি———আরও অনেক কথা লিখে ক্ষমা চেয়ে স্ট্যাটাস দিল”।
লাভ হলোনা কিছুই, পুলিশ এসে রসরাজকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে গেলো। এতো গেলো রসরাজের খেলা খতমের ইতিহাস।
ফেসবুকে রসরাজের চেয়েও অনেক বেশী অভিজ্ঞ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অধিপতি এবং চেলাচামুন্ডাগণ। তারা বিজ্ঞানে, ফেসবুক কারিগরিতে অন্য সকলের চেয়ে একশ ডিগ্রি উপরে। স্বয়ং জুকারবার্গও জানেনা, কিন্তু তারা জানে কি করে বলগ দিয়া ইন্টারনেট চালাতে হয়। বলগ দিয়া ইন্টারনেট চালাতে গিয়ে তারা পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই ইন্টারনেট চালু করে দিয়েছে। ইন্টারনেটের আগুনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জ্বলছে, জ্বলছে এতদিনকার বন্ধুত্ব, পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা, সব সব সব জ্বলছে।

আসলে বাংলাদেশ ডিজিটাল হয়ে গেছেতো, মানুষ “চিলে কান নিয়ে গেছে” শোনার সাথে সাথে ডিজিটাল গতিতে চিলের পিছে দৌড় দেয়, অ্যানালগ পদ্ধতিতে আগে নিজের কানে হাত দিয়ে দেখেনা—বুঝলেন ?


Shares