100 GB Free Backup
This post has been seen 99 times.

বিপ্লবীর মৃত্যু নেই। কারণ সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতিতে ক্রিয়াশীল বিপ্লবীরা সাধারন মানুষের জন্য লড়াই করে। সাধারন মানুষের রুটি রুজি ও রাষ্ট্র নির্মানের লড়াই যতক্ষন পর্যন্ত শেষ না হয় ততক্ষন পর্যন্ত বিপ্লবীরা বার বার ভিন্ন নামে জন্ম নেয় সমাজের গর্ভে। আব্দুল মতিন সমাজ পরিবর্তনের ধারায় এরকমই একজন আজীবন বিপ্লবীর নাম। আব্দুল মতিন ১৯২৬ সালের ৩রা ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ধুবুলিয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল জলিল ও মা আমেনা খাতুনের প্রথম সন্তান আব্দুল মতিন। তাঁর ডাক নাম ছিল গেদু। আব্দুল মতিন দার্জিলিং গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে ১৯৪৩ সালে এন্ট্রাস (মাধ্যমিক), ১৯৪৫ সালে রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি এ পাস করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন, কিন্তুু রাজনৈতিক কারনে লেখাপড়া হয়ে উঠেনি।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান প্রতিষ্টার পর পর ডাক বিভাগের খাম, পোস্টকার্ড, মানি অর্ডার ফরম ইত্যাদিতে ইংরেজীর সাথে উর্দু লেখা শুরু হয়। তার প্রতিবাদ করেন প্রাদেশিক সচিবালয়ের ইডেন বিল্ডিংয়ের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীবৃন্দ। তাদের সেই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যুক্ত হন আব্দুল মতিন। ১৯৪৮ সালের প্রথম ভাষা আন্দোলনের সময়েই ২৪ মার্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের ভাষনে পাকিস্তানের বড় লাট কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ “উর্দু”কে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা ঘোষনা করলে মতিনের কন্ঠ থেকে প্রথম উচ্চকন্ঠের প্রতিবাদ “নো নো” ধ্বনিত হয়েছিল। আব্দুল মতিন প্রচন্ড ক্রোধে ফেটে পড়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জিন্নাহর মুখের উপর প্রতিবাদ করা কী পরিমান ঝুকিপূর্ণ-ছিল তা আজকের প্রজন্ম ভাবতেই পারবে না। তা ছিল একেবারেই রাষ্ট্রদ্রোহের সামিল। ১৯৪৮ সালে ঘটিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি যার আহবায়ক হন আব্দুল মতিন। এই কমিটিই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে প্রথম সংগঠিত রূপ দেয়। ১৯৫২’র ৩১শে জানুয়ারী মাওলানা ভাষানীকে আহবায়ক করে ৪০ সদস্য বিশিষ্ট সর্ব দলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হলে আব্দুল মতিন ছিলেন তার সক্রিয় সদস্যের একজন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্র“য়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার সভায় ১৪৪ ধারা জারি ভাঙ্গার সিদ্ধান্তটি পাশ হয়েছিল আব্দুল মতিনের জ্বালাময়ী ভাষনের প্রভাবে। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়টায় ভাষা আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত রাখার জন্য তাঁর সাধনার স্বীকৃতি হিসাবে ২১শে ফেব্র“য়ারীর আগেই তিনি “ভাষা মতিন” নামে অভিহিত হয়েছিলেন। আর ভাষা আন্দোলনই যেহেতু বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের সুতিকাগার-এজন্য ভাষা মতিনই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম রূপাকার। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের প্রধান ছাত্র-নেতা হিসাবে স্বীকৃত প্রবাদ পুরুষ আব্দুল মতিন। তিনি পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসাবে ১৯৫৩ সালে ২৯ ডিসেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত অল-পাকিস্তান স্টুডেন্ট কনভেনশনে যোগ দেন এবং পূর্ব-পাকিস্তানের পক্ষে তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রস্তাবগুলো হলো-১। বাস্তবতার ভিত্তিতে পাকিস্তানের দুটো ভাষা স্বীকৃত হোক-একটি উর্দু এবং অন্যটি বাংলা ২। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে ভৌগলিক এবং অন্যান্য কারনে সায়ত্ব-শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক এবং ৩। গনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু করার জন্য দেশ ব্যাপী ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলা হোক যার প্রথম লক্ষ্য হবে অগণতান্ত্রিক মুসলিমলীগ শাসনের পরিবর্তন।

ভাষা মতিন হিসাবে পরিচিতি সত্ত্বেও আব্দুল মতিন এদেশের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একজন অগ্রনায়ক ছিলেন, সে জন্য তাঁর রাজনৈতিক সাথীদের কাছে তিনি ছিলেন কমরেড আব্দুল মতিন। আশির দশক থেকে বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক মডেলগুলোর পতন পর্ব শুরু হওয়ার পর অনেক নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিষ্ঠ নেতা-কর্মী বিভ্রান্ত হয়ে সমাজতন্ত্রের দর্শনকেই পরিত্যাগ করেছেন। কিন্তুু আব্দুল মতিন আজীবন তাঁর মতাদর্শে ছিলেন অবিচল। আমৃত্যু আদর্শচ্যুত হননি। রাষ্ট্রের দৈন্যের কারনেই ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনকে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া হয়নি। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে অপারগতা এই রাষ্ট্রের কর্তাব্যাক্তিদের ব্যর্থতা এবং সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক। ভাষা মতিন রাষ্ট্রের বড় মাপের আমলা হতে পারতেন, তথাকথিত রাজনীতিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে গড়ে তুলতে পারতেন সম্পদের পাহাড়। কিন্তুু এসবের প্রতি কখনো তাঁর কোন মোহ ছিলনা। রাষ্ট্রভাষা মতিন তাঁর দীর্ঘ জীবনের বাঁকে বাঁকে প্রতিটি পদক্ষেপে জনগনের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন, আজীবন লড়েছেন একটি সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে। জীবনে তাঁকে কারাবরণ গ্রহন করতে হয়েছে কয়েকবার। প্রথমবার ১৯৪৯ সালে, দ্বিতীয় বার ১৯৫২-১৯৫৩ সাল, তৃতীয় বার ১৯৬২-১৯৬৫ সাল, চতুর্থ বার ১৯৭২-৭৭ এবং পঞ্চম বার ১৯৮৬ সালে। চরম বিপরীত ¯্রােতে দাড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে শিখিয়েছেন ভোগ-বিলাস নয়, জনগনের স্বার্থে জীবন দেয়ার মত গৌরব আর কিছুতেই নেই। প্রতিনিয়ত আত্ম-স্বার্থ ও আত্ম-প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই অর্জন করা যায় জনগনের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। আব্দুল মতিন আদর্শিক রাজনীতির সাহসী যোদ্ধা ও কিংবদন্তী। সারা জীবন এই জাতিকে তিনি শুধু দিয়েই গেলেন। এমনকি মৃত্যুর পর নিজের দেহ এবং চোঁখ দুটো পর্যন্ত দান করে দিয়ে গেলেন মানবকল্যাণে। চৌদ্দ দলীয় সরকার (আওয়ামীলীগ) কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এ জন্য যে, আব্দুল মতিনের মস্তিস্কে অস্ত্রোপচারের পরপরই স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন এবং ভাষা সংগ্রামী আব্দুল মতিনের চিকিৎসার সকল দায়-দায়ীত্ব সরকার গ্রহণ করেছে বলে জানেন।

২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মজলমু জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী পরিষদের সভাপতি এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিষ্ট লীগের কেন্দীয় উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ছিলেন। ০৮/০৯/২০১০ বুধবার সকাল ৯ ঘটিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় মৃত্যুবরন করেন রাষ্ট্রভাষা আব্দুল মতিন। নিভে যায় বাংলা ও বাঙ্গালী তথা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের প্রেরনার এক আলোক রশ্মি।

http://jugapath.com/wp-content/uploads/2017/02/1952_Bengali_Language_movement.jpghttp://jugapath.com/wp-content/uploads/2017/02/1952_Bengali_Language_movement-150x150.jpgjugapathএক্সক্লুসিভকলামশিল্প-সাহিত্যবিপ্লবীর মৃত্যু নেই। কারণ সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতিতে ক্রিয়াশীল বিপ্লবীরা সাধারন মানুষের জন্য লড়াই করে। সাধারন মানুষের রুটি রুজি ও রাষ্ট্র নির্মানের লড়াই যতক্ষন পর্যন্ত শেষ না হয় ততক্ষন পর্যন্ত বিপ্লবীরা বার বার ভিন্ন নামে জন্ম নেয় সমাজের গর্ভে। আব্দুল মতিন সমাজ পরিবর্তনের ধারায় এরকমই একজন আজীবন বিপ্লবীর নাম। আব্দুল...

Comments

comments