100 GB Free Backup
This post has been seen 21 times.

‘পঞ্চায়েত’ হচ্ছে  বিরোধ নিষ্পত্তি , নির্দেশ কিংবা পরামর্শ প্রদানের ক্ষমতা প্রাপ্ত একধরনের  স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা , প্রথম দিকে যা হিন্দু শাসন ব্যবস্থাতেই  প্রচলিত ছিল ।  এবং পরবর্তীতে এটি মুসলিমগণ শাসন ব্যবস্থাতেও জনপ্রিয়তা লাভ করে। হিন্দু পঞ্চায়েত ব্যবস্থার  মূল ভিত্তি ছিল ছিল বর্ণ কিংবা জাত , কিন্তু  মুসলিম পঞ্চায়েত ব্যবস্থাটি -প্রধানত ধর্মীয়-ভিত্তিক ছিল না, তাদের কাজ ছিল বিচার-সালিশ সমাধান এবং এলাকাবাসীর স্বার্থ সংরক্ষণ, আদেশ উপদেশ বিনিময়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ’র পর নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ , যখন ঢাকার মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে নিয়োজিত হলেন -তখন নওয়াব পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকায় মুসলিম পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় একটি গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। তথাকথিত ভদ্রলোকরা  ঢাকা শহরের আদিবাসীদের’কুট্টি’ বলে সম্বোধন করতেন । কুট্টিদের থেকে নিজেদের আলাদা করে দেখতেন। কারণ, কুট্টিদের অধিকাংশ ছিলেন অশিক্ষিত ও দরিদ্র। কিন্তু ঢাকায় তারাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ । মহল্লায় মহল্লায় তাদের নিয়ন্ত্রণে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তখন যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিল।

৬০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত গোটা আইয়ুবী শাসনামল জুড়ে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় অফিস ছিল ৩১/১ হোসেনী দালান রোডে। ছাত্র ইউনিয়নের অফিসের জন্য এই এলাকাটি বেছে নেয়ার প্রথম কারণটি ছিল -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,  মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অবস্থান ছিল অফিসের নিকটতম দূরত্বে , আর দ্বিতীয় প্রধান এবং অন্যতম কারণটি ছিল , একজন স্থানীয় প্রভাবশালীর প্রটেকশন পাবার নিশ্চয়তা। হোসেনী দালান এবং তার আশপাশের এলাকায় , সেই ব্যক্তিটির প্রতাপ ও প্রভাব এমন মাত্রাতেই বিরাজমান ছিল , সেখানে আইয়ুব মোনায়েমের পেটোয়া বাহিনীর গুণ্ডারা বা প্রতিক্রিয়াশীলরাও সাহস করত না , মাস্তানি বা দাপট প্রদর্শনের । কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড ফরহাদ, কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তী , রণেশ দাশগুপ্ত স্বীকার করেছেন , সময় অসময়ে পার্টির আণ্ডারগ্রাউণ্ড নেতাদের জন্য তিনি ছিলেন-এক ভরসার নাম। কমরেড মণি সিং পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে তাঁর বাসায় রাত পর্যন্ত কাটিয়েছিলেন। এই প্রভাবশালী ব্যক্তিটি  জন্ম গ্রহণ করেছিলেন  ১৮৯৩ সালে । তাঁর পিতা মুন্‌নু সরদারের মৃত্যুর পর স্বাভাবিক রেওয়াজ অনুযায়ী ১৯৪৪ সালে,  ৫১ বছর বয়সে তাঁকে পাগড়ি পরিয়ে সরদার উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল । ১৭ বছর পঞ্চায়েত দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৬১ সালে ৬৮ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। ১৯৫২ সালে, তিনি তখন ঢাকার ২২ পঞ্চায়েত প্রধানদের মধ্যে অন্যতম একজন ।

একুশে (1)২৬ জানুয়ারি ১৯৫২ : পাকিস্তান গণপরিষদ বরাবরের মতো এবারও ঘোষণা করে দিল উর্দু’ই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

২৭ জানুয়ারি ১৯৫২ : রেসকোর্স ময়দানে ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ যে ঘোষণা করেছিলেন “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা” চারবছর পর পল্টন ময়দানে , প্রধানমন্ত্রী জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিনও একই কথা কইলেন। উপস্থিত জনতা সাথে সাথে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত করে দিল  সমগ্র পল্টন ময়দান ।

২৮ জানুয়ারি ১৯৫২ : পূর্ব-পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীপরিষদকে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্রীড়নক হিসাবে আখ্যা দিয়ে  নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যকে সম্পূর্ণ রূপে বাতিল ঘোষণা করে দিল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।

৩০ জানুয়ারি ১৯৫২ : সংগ্রাম পরিষদের ডাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পালিত হল সর্বাত্মক ধর্মঘট।

৩১ জানুয়ারি ১৯৫২ : ভাসানীর সভাপতিত্বে পূর্ব-পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত হল ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ । সিদ্ধান্ত হল আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানে পালিত হবে সাধারণ ধর্মঘট।

৪ঠা ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ : ছাত্রদের ডাকে , ঢাকা শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বত:স্ফূর্ত ভাবে ধর্মঘট পালিত হল। তৎকালীন সময়ের শহরের সবচেয়ে বড় মিছিলটি প্রদক্ষিণ করল  ঢাকা শহরের রাজপথ।

১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ : ২১ ফেব্রুয়ারি ডাকা সাধারণ ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি পূর্বক  সকল সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করল পাকিস্তান সরকার।

২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ : পাকিস্তান সরকারের অন্যায্য ১৪৪ ধারা জারির পরিপ্রেক্ষিতে , সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ একসভায় মিলিত হল,  কেউ কেউ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে মত দিলেও অনেকেই সহিংসতা আশঙ্কা করে মত দিলেন বিপক্ষে।

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ :

সকাল ৯ টা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা মেডিকেল গেট সংলগ্ন আমতলায়, ভীর জমাতে লাগল ছাত্র-ছাত্রী সাধারণ মানুষ।

সকাল ১১ টা : সমাবেশে আওয়ামী মুসলিম লীগ সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক , ছাত্রদের ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার ব্যাপারে যুক্তি তুলে ধরলেন , সহমত জানালেন উপাচার্য ড. এস এম হোসেইন সহ অপরাপর শিক্ষকগণ।

বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টা : উপস্থিত আব্দুল মতিন এবং গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে মত দিলেও সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হলেন । নেতাদের মধ্যে প্রচণ্ড মতানৈক্য দৃশ্যমান হল । উপস্থিত সাধারণ ছাত্ররা নেতাদের এই রকম দ্বিধা বিভক্তিতে, এক পর্যায়ে নিজেরাই সম্মিলিত ভাবে সিদ্ধান্ত নিল ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে ফেলার । ছাত্রজনতার স্বত:স্ফূর্ত মিছিলটি বর্তমান জগন্নাথ হল অভিমুখে যাত্রা শুরু করল । সাথে সাথেই পুলিশ এসে শুরু করে দিল ব্যাপক লাঠিচার্জ ,  শুরু করে দিল  গুলি বর্ষণ । মুহূর্তের ভেতর  গুলিবিদ্ধ  হয়ে রাজপথে শায়িত হল বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্স ছাত্র আবুল বরকত , রফিকউদ্দিন আহমদ এবং আব্দুল জব্বার নামীয় তিন তরুণ । ৯ বছরের বালক অহিউল্লাহও , কেন যে মরতে এসেছিল জানা যায় নি তার কারণ। অনেককে ভর্তি করা হল হাসপাতালে । বেশ কিছুদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থেকে অবশেষে  মারা গেল সচিবালয়ের পিয়ন আব্দুস সালাম । পুলিশের সাথে ছাত্রদের সংঘর্ষটি স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ৩ ঘণ্টা । পুলিশের প্রচণ্ড গোলাগুলিতেও ছত্রভঙ্গ হয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করল না কিন্তু অধিকাংশ ছাত্রজনতা।

বেলা ৪টা : ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনার খবর পেয়ে , ফুঁসে উঠল পুরো শহর । হাজার হাজার সাধারণ জনতা ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে জড়ো হতে থাকল । এই খবর আইন পরিষদে পৌঁছালে,  ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার ছয়জন আইন পরিষদ সদস্য , আইন পরিষদ সভা মুলতবী করে ঢাকা মেডিকেলে আহত ছাত্রদের দেখতে যাবার জন্য মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে অনুরোধ করলেন । সরকারী দলের সদস্য আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশও এই প্রস্তাবের সপক্ষে উচ্চকণ্ঠ হয়েছিলেন , কিন্তু নুরুল আমিন সকল দাবি উপেক্ষা করে আইন পরিষদের অধিবেশন চালাবার নির্দেশ প্রদান করলেন।

২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ : হাজার হাজার ছাত্র জনতা সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জড়ো হতে থাকলো । উপস্থিত ছাত্র-জনতা ২১ ফেব্রুয়ারি নিহতদের স্মরণে কার্জন হল এলাকায়  জানাজা নামাজ আদায় করে একটি শোকমিছিল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। আচমকা শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর পুলিশ আবার গুলিবর্ষণ চালালো ,  ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হল চারজনের , তন্মধ্যে ইতিহাসে নির্দিষ্ট হলে শুধু মাত্র ‘শফিউর রহমান’ নামীয় এক জন । উত্তেজিত জনতা সরকারের পত্রিকা “দি মর্নিং নিউজ ” এর অফিসে আগুণ ধরিয়ে দিল । নুরুল আমিনের নির্দেশে রাস্তায় নামল সামরিক বাহিনী । কিন্তু পুলিশ সেনাবাহিনী ব্যারিকেড উপেক্ষা করে  ছাত্র-জনতা ভিক্টোরিয়া পার্ক মুখে জমায়েতে সামিল হতে লাগল। উপায়ন্তর না দেখে নুরুল আমিন, তড়িঘড়ি করে আইন পরিষদে , বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আনলেন, প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাশ হল।  পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম , কোন জাতিকে,  মৃত্যু দিয়ে কিনতে হল তার মায়ের মুখের ভাষা।

একুশে (5)

এই ব্যাপার’টি আদতেই ছিল বড়ো বিস্ময়ের! ঢাকার আদি বাসিন্দাদের কথ্য ভাষা ছিল এক ধরনের আঞ্চলিক উর্দু ভাষারই অন্য রূপ । তাই রাষ্ট্রের ‘ভাষা’ বাংলা না উর্দু এ নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা থাকবার কোন কারণ ছিল না ।  উর্দু হলে বরং তাদের খুশি হওয়ারই কথা ছিল। ৪৭ থেকে শুরু হওয়া চলমান ভাষা আন্দোলনে ঢাকার আদি বাসিন্দাদের  তেমন ভাবে সক্রিয় হতে দেখা যায় নি। ফেব্রুয়ারি ২১ তারিখেও ব্যাপারটি ঠিক ঠিক বোঝা গেল না । কিন্তু ২২ ফেব্রুয়ারি আগের দিন নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠানের আগেই–ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা ! ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান শ্লোগান দিতে দিতে , আদি ঢাকার বাসিন্দা’রা মহল্লা থেকে জানাজায় যোগ দিতে ,নেমে এল রাস্তায়। পাকিস্তানের এইরূপ নৃশংসতায় আর ঘরে বসে থাকতে পারল না তারা কেউই, নীরবতা ভেঙ্গে জেগে উঠল পুরাণ ঢাকা,  প্রথম বারের মত সেদিন।

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ : সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানে স্বত:স্ফূর্তভাবে ধর্মঘট পালিত হল । সমগ্র শহর জুড়ে আতংক । উর্দু’কে আর টিকিয়ে রাখা গেল না , তাই সরকার বাহিনীর রক্তের শিরায় শিরায় তখন সুতীব্র ক্রোধ , চাই আরও নৃশংসতা , তাদের রক্তচক্ষুতে জ্বলছিল  প্রতিশোধের আগুন- শহরময় চলছিল সরকারের পেটোয়া বাহিনী’র নিশ্ছিদ্র মহড়া । আর ওদিকে বৃক্ষ রাজির পাতা খসে খসে পড়ছিল রাজপথে , বসন্ত বাতাসে  মৃত্যুর জন্য শুধু ছিল গভীর কান্না , ছাত্র জনতা শোকে মুহ্যমান , ঢাকাবাসী স্তব্ধ এবং বিমূঢ় ।

ফেব্রুয়ারি ২১ তারিখের পর থেকেই ঢাকা মেডিক্যাল ছাত্রদের হোস্টেল হয়ে গেল আন্দোলনের মূল কেন্দ্রস্থল, যা ছিল না কোন সুরম্য ছাত্রাবাস । মুলিবাঁশ দিয়ে বানানো ব্যারাক টাইপ বিশ বাইশ খান ঘর। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদের সহ সভাপতি গোলাম মাওলা, সাধারণ সম্পাদক শরফুদ্দিন আহমদ, সাঈদ আনোয়ার , আলীম চৌধুরী প্রমুখ গভীর বেদনা বোধে আক্রান্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন- এখন বসে থাকার সময় নয়, ধীরে ধীরে শোক রূপান্তরিত হতে লাগল শক্তিতে- যে করেই হোক শহীদ মিনার নির্মাণ করতে হবে ! যে কোন প্রকারেই হোক স্মৃতি স্তম্ভ  নির্মাণ করতেই হবে! শহীদ মিনার নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হল ১২ নম্বর ব্যারাকের কাছে , যেখানে তখনও লেগে ছিল রক্তের ছোপ ছোপ । বদরুল আলম তৈরি করলেন নকশা । চারদিকে সান্ধ্য আইন , তার মধ্যে চলছে ভয়াবহ ধর্মঘট , চাইলেও বাইরে থেকে নির্মাণ সামগ্রী সংগ্রহ করা সম্ভব নয় । শহর জুড়ে সেনাবাহিনী আর পুলিশ ঘুরে বেড়াচ্ছে  যত্র তত্র । তাহলে কিভাবে নির্মাণ করা হবে এই শহীদ মিনার? সাথে সাথেই মিলে গেল সমাধান !  হোস্টেলের অদূরেই ছিল একটি গোডাউন , জানা গেল সেখানে  আছে সিমেন্টের পর্যাপ্ত মজুদ । আর গোডাউন সামনেই রাখা আছে ইট আর বালু। মেডিক্যালে তখন নির্মাণ কাজ চলছিল , গোডাউন সহ এইসব মালামাল মেডিক্যালে চলমান নির্মাণ কাজেরই  মালামাল !  কিন্তু এই মালামালের  মালিক কে ,কোন এক  ঠিকাদারের নিশ্চয়ই ! আলী আজগর নামে এক ছাত্র জানালো, সে এই ঠিকাদারকে চেনে । তাই সিদ্ধান্ত হল ঠিকাদারের সাথে দেখা করে , তাকে অনুরোধ করা হবে -যেন তিনি নির্মাণ সামগ্রী দিতে রাজী হন। আলী আজগর, আহমদ রফিক সহ আরো কয়েকজন -রাতের আঁধারে কারফিউর মধ্যেই, চুপি চুপি রেল লাইন ধরে রওনা হল ঠিকাদারের বাড়ি।  বাড়িতেই ছিলেন ঠিকাদার, ছাত্ররা তাঁর সামনে গিয়ে শহীদ মিনার বানানোর জন্য তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করল।  জানতে পারা গেল  গেল ২১ তারিখ এই ঠিকাদারই, পুলাপাইনগো টিয়ার গ্যাস থেকে বাঁচানোর লাইগা ড্রামে ড্রামে পানি ভর্তি কইরা রাখছিল , বাসার সামনে , এবং ছাত্ররা সেই পানিতে চোখ মুখ ধুইতেও পারছিল!

একুশে (3)

ঠিকাদার জানালেন শুধু মাল দিয়া ,ক্যামতে কী ? মিস্ত্রী ভি লাগবো ! দ্রুত  খবর লাগালেন রাজমিস্ত্রিদের । তিনি পাকিস্তান সরকারের ঠিকাদার এবং তিনি সরকার বিরোধী রাজনীতিও করেন না ! তাই  এই কাজে লিপ্ত হওয়াটা  তাঁর জন্য ছিল মারাত্মক ঝুঁকির । ওয়ার্কঅর্ডার ও লাইসেন্স ক্যান্সেল্ড হয়ে যাবে, তাঁর কোম্পানির নাম উঠে যাবে ব্ল্যাক-লিস্টে ,  আটকে যাবে তাঁর সকল বিল , সকল পাওনা । এই কাজে সহযোগিতা করবার জন্য -শুরু হয়ে যেতে  পারে হয়রানি , নির্যাতন , জেল জুলুম , পাকিস্তান সরকার চাইলে ,  যা খুশি তাই করে  দিতে পারে  ! ইতোমধ্যে চলে এসেছে দুইজন রাজমিস্ত্রি , তিনি রাজমিস্ত্রিদের শহীদ মিনার নির্মাণে , ছাত্রদেরকে সাহায্য করার কথা বলে দিলেন ।  এই ঠিকাদারটিকে  দেখা যাচ্ছে ভাবলেশহীন কিন্তু অসম্ভব  তাঁর সাহস!  তিনি ছাত্রদেরকে  গোডাউনের চাবি ফিক্কা দিয়া কইলেন -লিয়া যাও চাবি , যেমতে যা লাগে , যা মুঞ্চায় , মালছামান নিয়া কামে নাইম্যা পড় , খালি হক্কালে মনে কইরা চাবিডা দিয়া গেলেই হইব!  দৌড়াও মিয়া তোমাগ হাতে টাইম ভি নাইক্কা ! পাকিস্তান পুলিশ আর সেনাবাহিনীর কঠিন নিরাপত্তার চাদর উপেক্ষা করে , ছাত্ররা ফিরে এসে গোডাউন খুলে রাতের অন্ধকারেই শুরু করে দিল শহিদ মিনার বানানোর  কাজ । ডাক্তার নার্স ছাত্ররা , সবাই হাতে হাত মিলিয়ে -একজন তুলে দিচ্ছে আরেকজনের হাতে ইট । রুগীর স্ট্রেচার ট্রলিতে উঠে গেল বালি আর সিমেন্ট। রাতভর কাজ চলতে চলতে ফুটে উঠল ভোরের আলো – তখন দেখা গেল সেই  আবছা আলোতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পড়েছে -প্রথম  শহিদ মিনার । উচ্চতা হল দশ ফুট , চওড়া হল ছয় ফুট , সাত ফুট হল তার ভিত্তি । মিনারের গায়ে সেঁটে দেয়া হল দুইটি পোস্টার , মধ্যভাগে লেখা হল ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’ আর নীচের দিকে লেখা হল ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’। যারা যারা ছিলেন সেই কাজে – আব্দুর রশীদ , আব্দুস সামাদ, আব্দুস সালাম, আবুল হাশিম, আলী আছগর , আলীম চৌধুরী আশেক , আসাদুজ্জামান, আহমদ রফিক, ইসমাইল, কবীর , কাজী আনোয়ারুল হক, কাদের গোলাম মাওলা, জহুরুল হক , জাহেদ জিয়া, জেকো তাহের, নওয়াব হোসেন প্রধান , ফজলুল মতিন, ফরিদুল হুদা , বদরুল আলম, মকসুদ, মঞ্জুর হোসেন, মর্তুজা , মামুনুর রশীদ , রাব্বি , শরফুদ্দিন আহমদ , শাহজাহান , সাঈদ হায়দার , সিরাজ জিন্নাত , হাবিবুর রহমান, হুমায়ুন আবদুল হাই প্রমুখ ।

একুশে (2)২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ : সকাল ১০টার দিকে শহীদ শফিউর রহমানের পিতা এসে স্মৃতিস্তম্ভটির ফলক উন্মোচন করলেন। এদিকে নুরুল আমিন সর্বত্র সেনাবাহিনী এবং পুলিশ মোতায়েন করে দিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সব কিছু ঠাণ্ডা , স্বাভাবিক করার ঘোষণা দিয়ে দিলেন । ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ভাষা আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায় সকল শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হল।

২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ : ছাত্র বিক্ষোভকে দমাতে ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হল অনির্দিষ্টকালের জন্য।

২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ : শহিদ মিনার পুনরায় উদ্বোধন করলেন -আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন , তিনি মুসলিম লীগের সদস্য হয়েও পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করলেন । বিকেল বেলা মুহূর্তের মধ্যে কোথা থেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশ এসে স্থাপিত “শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ”টি গুড়িয়ে দিল চিরস্থায়ী ।

পূর্ব পাকিস্তানের নিয়তি  নির্দিষ্ট হয়ে গেল সাথে সাথে , ১৯৭১ সালে পূর্বপাকিস্তান দেশটি আর থাকবে না , তার নাম হয়ে যাবে ‘বাংলাদেশ’ , সেই খবরটি  জানতে পেরে গিয়েছিল সমগ্র দেশ,  কিন্তু কিছুই  মালুম করতে পারল না ব্লাডি নুরুল আমিন আর তাঁর  দেশ পাকিস্তান। 

 

ঢাকার ২২ পঞ্চায়েত প্রধানদের মধ্যে অন্যতম  সেই প্রভাবশালী মানুষটির নাম ছিল  ‘পিয়ারু সরদার’ এবং তিনিই ছিলেন সেই ঠিকাদার – প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের নেপথ্য নায়ক। ২০১৫ সালে সরকার, তাঁকে মরনোত্তর একুশে পদক প্রদান করেন।

 

‘পিয়ারু সরদার’ আপনাকে  স্মরণ করছি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।

 

“অশ্রুমেশা আমাদের সেই প্রথম শহিদ মিনার

যদিও আজ দাঁড়িয়ে নেই আর,

বর্তমানের মিনারেই তো রয়েছে স্মৃতি তার

আর স্মৃতিতে আজও আছেন পিয়ারু সরদার!

 

পরান ঢাকার নতুন দিনের যে মানুষটিকে পাই

ভুলেছি তাঁকে ? –পিয়ারু ভাই, আপনাকে ভুলি নাই!”

 

পিয়ারু সর্দার স্মরণে- সৈয়দ শামসুল হক হক।

একুশে (6)তথ্য সূত্রঃ

(১) ‘পিয়ারু সরদার :পঞ্চায়েত প্রধানের চেয়ে বড় যার অবদান’– মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম  (২) ‘শহিদ মিনার ও পিয়ারু সরদার’ আনিসুজ্জামান , (প্রথম শহিদ মিনার ও পিয়ারু সরদার , বাংলা একাডেমি , সেপ্টেম্বর ২০১৬ গ্রন্থ থেকে ) ও উইকিপিডিয়া।

ছবিঃ ইন্টারনেট ও লেখক।

jugapathUncategorizedক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা মঙ্গলবার ২১ফেব্রুয়ারী২০১৭, পূর্বাহ্ন ০২:২৫ ‘পঞ্চায়েত’ হচ্ছে  বিরোধ নিষ্পত্তি , নির্দেশ কিংবা পরামর্শ প্রদানের ক্ষমতা প্রাপ্ত একধরনের  স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা , প্রথম দিকে যা হিন্দু শাসন ব্যবস্থাতেই  প্রচলিত ছিল ।  এবং পরবর্তীতে এটি মুসলিমগণ শাসন ব্যবস্থাতেও জনপ্রিয়তা লাভ করে। হিন্দু পঞ্চায়েত ব্যবস্থার  মূল ভিত্তি ছিল ছিল বর্ণ কিংবা জাত ,...