প্রচ্ছদ


বীরবিক্রমের সুপারিশ, রাজাকারপুত্র শিবির নেতাকে উপসচিব বানাতে

24 December 2017, 02:49

নিজস্ব প্রতিবেদক
মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী সরকার বীরবিক্রম (বাঁয়ে) ও ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা মো. শামছুল আজম (ডানে)। সংগৃহীত ছবি
This post has been seen 203 times.

কুড়িগ্রাম জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও নীলফামারী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কর্মরত শামছুল আজমকে উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। এই ‘সুপারিশসহ অনুরোধ’-এর প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন চিলমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী সরকার বীরবিক্রম এবং সাবেক সংসদ সদস্য, কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর আলী।

২০তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা শামছুল আজমের পদোন্নতি চেয়ে সুপারিশ করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ওই দুই নেতা। সেই সুপারিশমালা বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

কুড়িগ্রাম ও চিলমারীতে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শামছুল আজম কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি কুড়িগ্রাম জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতিও ছিলেন।

স্থানীয়রা বলেন, শামছুল আজমের বাবা মো. সিরাজুল হক মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। মুক্তিবাহিনীর তথ্য পাক-হানাদার বাহিনীর কাছে দেওয়ার সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আটক ও মারা যান। এমন একজন রাজাকারের সন্তান শামসুল আজমকে মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী পরিবারের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করায় এলাকায় ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

৬ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা মোজাফ্ফর আহমেদ বলেন, ‘এ রকম সুপারিশ প্রদান করার জন্য যারা এ কাজ করেছে, তাদেরকে আমরা ধিক্কার জানিয়েছি।’

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের এই ডেপুটি-কমান্ডার আরও বলেন, ‘এর আগে চিলমারীর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমাদের জানান, মো. শামছুল আজম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের নেতা ছিলেন। ওই কর্মকর্তার এক ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন শামছুল। আর শামছুল আজমের বাবা যে রাজাকার ছিলেন, সেটার আমি প্রত্যক্ষদর্শী। চিলমারীর লোক হিসেবে আমরা জানতাম, সিরাজুল হক শান্তি কমিটির সদস্য।’

‘মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময় ৬ নম্বর সাব-সেক্টরের কমান্ডার নওয়াজেশ আলীর নির্দেশে কুড়িগ্রামের হালাবট নামক স্থান থেকে শামছুলের বাবা রাজাকার সিরাজুল হককে আটক করা হয়। আটকের পর তাকে নওয়াজেশের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়’, বলেন মুক্তিযোদ্ধা মোজাফ্ফর।

তিনি আরও বলেন, ‘আটকের সময় সিরাজুল হকের পকেটে কিছু কাগজপত্র পাওয়া যায়। কোথায় কোথায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি, সেসব তথ্য সংগ্রহ করে সে পাক হানিদার বাহিনীর কাছে পাঠাচ্ছিল। কুড়িগ্রাম থেকে পাক-হানাদারদের কাছে ওই তথ্য পাঠানোর সময় পথিমধ্যে তাকে আটক করা হয়। তার কাছে এ রকম তথ্য থাকায় বুড়াবুড়িতে নিয়ে ধরলা নদীর পাড়ে তাকে গুলি করে পুঁতে ফেলা হয়।’

আলাদা দুটি প্রত্যয়নপত্রে সুপারিশ করে বলা হয়, ‘এই মর্মে প্রত্যয়ন করা যাচ্ছে যে, মো. শামছুল আজম, পিতা মো. সিরাজুল হক, গ্রাম : মৌজাখানা, পো : বালাবাড়ী হাট, উপজেলা : চিলমারী, জেলা : কুড়িগ্রাম। আমি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি ও জানি। তিনি চিলমারী উপজেলার উক্ত এলাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। তাঁর বড় ভাই ডা. মো. শামছুদ্দোহা একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা। জানা মতে, পরিবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। তাঁর স্বভাব চরিত্র ভাল। তিনি কোন রাষ্ট্রদ্রোহী কিংবা সমাজ বিরোধী কাজের সাথে জড়িত নন। ২০তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের একজন সৎ কর্মকর্তা হিসেবে এলাকায় তাঁর অনেক সুনাম রয়েছে। পরিচিতি নং-৬৮০৯। বর্তমানে সচিব, জেলা পরিষদ, নীফামারী হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁকে উপসচিব হিসেবে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করছি।’

তবে এ ধরনের সুপারিশ করা ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন চিলমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মুক্তিযোদ্ধা বীরবিক্রম শওকত আলী সরকার। তিনি  বলেন, ‘ও শিবির করতো কিনা, তা আমি জানতাম না, পরে শুনলাম বিষয়টা। চাকরি কীভাবে পেয়েছে, তাও আমি জানি না। আমার এলাকার ছেলে, সুপারিশ চেয়েছিল। সুপারিশ করাটা ভুল হয়ে গেছে।’

তার বাবা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে শওকত আলী সরকার বলেন, ‘উনার বাপ রাজাকার ছিল, তা তো ইয়ে না…। উনার বাপের বিষয়ে তো আমি কোনো কথা বলিনি। তার বাপেরে মুক্তিযোদ্ধারা মারছে।’

ওই সুপারিশমালায় বাবা রাজাকার ছিলেন এমনটা উল্লেখ না থাকলেও মো. শামসুল আজমের বড় ভাই ডা. মো. শামছুদ্দোহাকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বীরবিক্রম শওকত আলী সরকার বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ছিলাম। শামছুদ্দোহাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’

তাহলে কেন শামছুজ্জোহাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুপারিশমালায় উল্লেখ করলেন জানতে চাইলে শওকত আলী বলেন, ‘প্রত্যয়নপত্রে কী লিখে নিয়ে আসছিল, তা আমি ভালো করে দেখি নাই। যদি এরকম হয়ে থাকে, তাহলে সেটা ভুলই হয়ে গেছে।’

এ বিষয়ে কথা বলতে সাবেক সাংসদ ও কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল গেলেও তা কেউ রিসিভ করেননি।

মো. শামছুল আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, এরকম প্রত্যয়নপত্রের ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না।

তবে কুড়িগ্রামের এক সাংবাদিক জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলে শামছুল আজমের এক ভাই তাকে প্রতিবেদন না করার জন্য হুমকি দেন।

সৌজন্যে: প্রিয়ডটকম।



Shares