প্রচ্ছদ


স্বপ্ন এবার সত্যি হলো…

28 December 2017, 14:07

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 194 times.

সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করার বিষয়ে আশাবাদী। এ জন্য কাজের গতি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। দ্রুত এগিয়ে আসছে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা। ২০০৭ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির সংশোধিত মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী বছরের শেষ দিনে। অর্থাৎ কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় বাকি আছে এক বছর। এরই মধ্যে কর্মযজ্ঞের ৪৯ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে সেতুটির প্রকল্প অফিস জানিয়েছে। প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আর মাঠ পর্যায়ে সেতুটির ভৌত কাজ ৫১ শতাংশ শেষ হয়েছে অক্টোবরে, জানিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় গঠিত ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটি।

জানা গেছে, অবশ্য নির্দিষ্ট সময়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য অর্জনের বিষয়ে অনেকটাই সন্দিহান আইএমইডি। সেতুটির কাজ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় আট মাস পিছিয়ে আছে বলে বিভাগের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এ প্রকল্পের কাজ শেষ করার বিষয়ে আশাবাদী সরকার। এ লক্ষ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে নেয়া হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগ। কাজে লাগানো হচ্ছে বড় আকারের যন্ত্রপাতি। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখা গেছে প্রকল্প  এলাকায়। সরেজমিন দেখা যায়, মাওয়ার ৩ নম্বর পিয়ারে পাইলের ওপর বেইজ তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। বেইজের রড বাইন্ডিং চলছে এখন। এরপরই খুঁটি উপর দিকে উঠবে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, ডিসেম্বরেই দ্বিতীয় স্প্যান দুইটি পিলারের ওপর স্থাপন করার লক্ষ্য রয়েছে। তাই প্রকল্প এলাকায় দিনরাত কর্মযজ্ঞ চলছে। আবার লক্ষ্য পূরণে ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে স্প্যান বসানো নাও হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি আরও জানান, মাটির বিভিন্ন রকম গঠন থাকে, সময়ে তা পরিবর্তিতও হয়। এরকমই একটি বিষয় নিয়ে আমাদের এখন কাজ করতে হচ্ছে। প্রয়োজনে জনবল ও যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে হলেও নির্দিষ্ট সময়ই সেতুর কাজ শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। পদ্মা সেতু প্রকল্পের দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, ‘৭বি’ নম্বরের দ্বিতীয় স্প্যানটি ৩ হাজার ৬শ’ টন ওজন ক্ষমতার বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাসমান ক্রেনে জাজিরা প্রান্তের ৩৮ ও ৩৯ নম্বর পিয়ার স্থানে নেয়া হবে। তাই শতভাগ প্রস্তুত এ স্প্যানটি এখন মাওয়া প্রান্তের কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে অপেক্ষার প্রহর গুনছে। ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ও ২ হাজার ৯শ’ টন ওজন ক্ষমতার স্প্যানটির চূড়ান্ত পেইন্টিং শেষে রূপ নিয়েছে ধূসর রঙে। ভাসমান ক্রেনটি চলাচলে নাব্য সঙ্কটের কবলে যাতে পড়তে না হয়, তার জন্য পদ্মা সেতুর চ্যানেলের ড্রেজিং কাজ শতভাগ সম্পন্ন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সেতুটির এক নম্বর  খুঁটির কাজ গত সপ্তাহে শুরু হয়েছে। প্রথম দিনেই সার্ভে অ্যান্ড সেটিং আউট কাজ শুরু হয়। এদিকে পরপর দুই দফা সম্ভাব্য তারিখ পরিবর্তনের পর চলতি ডিসেম্বর মাসেই মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে শতভাগ প্রস্তুত ‘৭বি’ নম্বরের দ্বিতীয় স্প্যানটি পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের ৩৮ ও ৩৯ নম্বর পিয়ারের স্থানে নেয়া হবে। মাওয়া প্রান্ত থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ৩ হাজার ৬০০ টন ওজনের ভাসমান ক্রেনে চড়ে দ্বিতীয় স্প্যানটি রওনা হবে।

এর আগে ১০ ডিসেম্বর প্রথম ও ১৫ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফা সম্ভাব্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছিল নানা জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের নৌ-চ্যানেলের নাব্য সংকট নিরসন ও পিয়ারের উপরিভাগের কাজ শতভাগ সম্পন্ন না হওয়ায় এখন ডিসেম্বর মাসের একদম শেষে দ্বিতীয় স্প্যানটি জাজিরা প্রান্তের পিয়ার স্থানে নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ রয়েছে। এরপরই ৩৮ ও ৩৯ নম্বর পিয়ারের ওপর দ্বিতীয় স্প্যানটি স্থাপন করে পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যে রূপ দিতে চলছে কর্মযজ্ঞ। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, জার্মানির তৈরি ১ হাজার ৯০০ ও ২ হাজার ৪০০ কিলোজুল ক্ষমতার হ্যামারের সঙ্গে ১৫ নভেম্বর ৩ হাজার ৫০০ কিলোজুল ক্ষমতার বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হ্যামারটি পাইলিং কাজে যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের কাজের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে জার্মানিতে বিশেষভাবে তৈরি করা হয় এ হ্যামারটি। বর্তমানে তিনটি হ্যামার দিয়ে পাইল ড্রাইভের কাজ চলছে। মাওয়া প্রান্তের সংযোগ সেতুর (ভয়াডাক্ট) ৬০টি পাইল স্থাপন হয়েছে শুক্রবার পর্যন্ত। জাজিরা প্রান্তে সংযোগ সেতুর পাইলের ওপারে খুঁটি উঠার প্রক্রিয়া চলছে। মাটির বিচিত্রতার কারণে নতুন ডিজাইন অনুযায়ী পাইল বসবে ১৬টি। এদিকে পদ্মা সেতুর বাকি ১৪টি খুঁটির নতুন ডিজাইন অনুমোদন পেতে মধ্য জানুয়ারি হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন দায়িত্বশীলরা।

পদ্মা সেতুর কাজ ৪৯ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে সেতু প্রকল্পের ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, মূল সেতুর কাজ শুরু হয়েছে ২০১৪ সালের নভেম্বরে। আগামী বছরের নভেম্বরের মধ্যে মূল সেতুর কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে মূল সেতুর কাজে অগ্রগতি হয়েছে ৫২ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় নদী শাসনের কাজে ৩৪ দশমিক ৩০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সেতুর জাজিরা সংযোগ সড়কের ৯৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ ও মাওয়া সংযোগ সড়কের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে।

সেতুর কাজ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় আট মাস পিছিয়ে আছে বলে গেল মাসে আইএমইডির তৈরি করা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, নদী শাসনের কাজ ৩৪ ভাগের বেশি শেষ হলেও এই সময়ে কাজের ৫৬ শতাংশ অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এ সেতুর কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। কাজে গতি আনতে কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা ব্যয় ধরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১১ সালে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকায়। সর্বশেষ ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেয়া হয়। দুই সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ১৮ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। এ সেতু নির্মাণ হলে ১৯টি জেলার যোগাযোগ সহজ হবে। ফলে দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২০ শতাংশ বাড়বে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

২৯০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় ধরে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। এছাড়া এডিবি ৬১ কোটি ৫০ লাখ,  জাপান ৪১ কোটি ৫০ লাখ ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ১৪ কোটি ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কথিত দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে অর্থায়নে দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নেয়। এ অবস্থায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তা না নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পের কাজ শুরু করে সরকার।

এদিকে পদ্মা সেতুর ৫০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বুধবার সিরাজদিখান উপজেলার মস্তফাগঞ্জ সেতু উদ্বোধন শেষে তিনি বলেন, মূল সেতুর কাজ অনেক এগিয়ে গেছে। পদ্মা নদী পৃথিবীর আমাজানের মতো একটি নদী, একবারে অনিশ্চিত একটি নদী। নির্দিষ্ট তারিখ দিয়েও আমরা সেই নির্ধারিত সময় রাখতে পারি না। ২য় স্প্যান বসতে আমাদের আরো  একটু সময় লাগবে। তিনি আরও জানান, পদ্মার নিচে এতো বেশি অনিশ্চিত পরিস্থিতি যেখানে গভীরতা মিলিয়ে টেকনিক্যাল কিছু সমস্যা আছে। আমাদের টার্গেট আমরা যথাসময়েই শেষ করব। একটি-দুইটি স্প্যান বসার পর সাত-আট দিন পর আরও ৩৯টি স্প্যান বসতে পারবে। কাজেই যথাসময়ে কাজ শেষ হওয়ার বিষয়ে আমরা আশাবাদী।

 

সূত্র : আলোকিত বাংলাদেশ


Shares