প্রচ্ছদ


জীবনে অনেক সময় প্রফেশন থেকে আবেগ বেশী কাজ করে: জেসমিন চৌধুরী

29 December 2017, 16:25

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 510 times.

জেসমিন চৌধুরী, যুক্তরাজ্য থেকেঃ কয়েকবছর আগের কথা। এক হাসপাতালে ইমারজেন্সি ইন্টারপ্রিটিং এর ডাক এলো। গিয়ে দেখি প্রাইভেট হাসপাতাল, বড়লোকদের ড্রয়িংরুমের মত পেইন্টিং আর শো পিসে সাজানো ওয়েটিং রুমে কিছুক্ষণ বসার পর রোগীর কামরায় নিয়ে যাওয়া হলো আমাকে।

রোগী অশীতিপর বৃদ্ধ, নব্বুইয়ের ওপরে হবে বয়স। তার কেবিনটাও কোনো বিলাসবহুল হোটেলের ফেকামরার মত সুন্দর করে সাজানো। জানালার কাছে একটা কাউচে বসে আছেন তিনি। আমাদেরকে দেখে ইঙ্গিতে শুভেচ্ছা জানালেন। দুটো চেয়ার টেনে নিয়ে তার সামনে বসলাম আমি এবং ডাক্তার।

কাজের শুরুতে আমাকে ক্লায়েন্টের ভাষা জেনে নিয়ে সেই অনুযায়ী কথা বলতে হয়। নিয়ম মাফিক আমি প্রশ্ন করলাম ‘আপনি কি সিলেটি?’ তিনি না-সূচক মাথা নাড়লেন।
‘বাংলাদেশের কোন জেলায় আপনার বাড়ি?’
উত্তরে তিনি কী একটা বললেন, আমি ঠিক ধরতে পারলাম না।
‘আমি কি বাংলায় কথা বলব?’
এবার উত্তরে তিনি শুধু শ্রাগ করলেন।

ডাক্তার আমাকে বলল উনার মূল সমস্যা স্মৃতিশক্তি সংক্রান্ত, কিছুই মনে রাখতে পারেন না বলে নানা ধরনের বিভ্রাট হয়। এমনিতে বয়সের তুলনায় শারিরীকভাবে যথেষ্ট সুস্থ আছেন তিনি। তাকে বাসায় পাঠানোর সময় হয়েছে কিন্তু তার আগে নিশ্চিত করতে হবে তিনি বাসায় ফেরার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত কী না।

এসব বিষয় আমি খুব একটা বুঝি না। আমার কাজ ক্লায়েন্টের কথা ডাক্তারকে এবং ডাক্তারের কথা ক্লায়েন্টকে বুঝিয়ে বলব, এতো তথ্যে আমার কী কাজ?
‘আপনি কি জানেন আপনি শীগগিরই বাড়ি যাচ্ছেন? বাড়ির কথা কিছু মনে আছে?’

উত্তরে তিনি কিছু একটা বললেন। বয়সের অথবা অন্য কোনো সমস্যার কারণে তার জিহ্বা জড়িয়ে যাচ্ছিল, কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু আমি এটুকু অন্তত বুঝতে পারলাম যে তিনি সিলেটি অথবা বাংলা কোনোটাই বলছেন না।

‘ক্লায়েন্ট ইজ নট স্পিকিং মাই ল্যাংগোয়েজ,’ আমি ডাক্তারকে বললাম।
‘কী বলছো? তার নাম থেকে তো আমরা ধরেই নিয়েছি তিনি বাঙ্গালি।’
কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে বলতে থাকল, ‘অবশ্য আগেরবার বাঙ্গালি ইন্টারপ্রিটার তার কোনো কথাই বুঝতে পারেনি । আমরা ভেবেছি হয়তো তার সিলেটি ইন্টারপ্রিটার প্রয়োজন তাই তোমাকে আনা হয়েছে।’

ডাক্তার তার কাগজ বের করে নামটা দেখালো। সারনেইম ব্যানার্জি। বাংলাদেশের না হোক, কোলকাতার বাঙ্গালি তো বটেই।

এবার আমি তার আরেকটু কাছে গিয়ে বললাম, ‘বাড়ি যাবেন, কেমন লাগছে?’
এবার মনে হলো তার কথা একটু একটু বুঝতে পারছি, অন্তত দুই একটা শব্দ।
‘……বিগ হাউস।…….ভেরি বিগ। ……লোনলি……’
‘আরে, আপনি তো ইংরেজি পারেন!’
বিস্ময়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। কেউ তার কথা বুঝতে পারছে জেনেই বোধ হয় বৃদ্ধের চোখের দৃষ্টিও আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আগ্রহের সাথে অনেক কথা বলতে শুরু করলেন।

এবার তার অস্পষ্ট উচ্চারণের বাক্যগুলোও আমি পুরোপুরিই বুঝতে পারলাম, যদিও তিনি খুব জড়ানো গলায়, অস্ফুট কণ্ঠে এবং থেমে থেমে, কিছুটা চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছিলেন।

‘আর ইউ জোকিং? আয়ভ লিভড হিয়ার অল মাই লাইফ। দিজ পিপল ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড মি। আই ডোন্ড নিড অ্যান ইন্টারপ্রিটার। আই জাস্ট নিড সামওয়ান টু লিসেন কেয়ারফুলি।’

বিস্ময়ে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল এবার। ওদিকে ডাক্তার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে অনুবাদের জন্য। আমি আবিষ্কারের খুশীতে আত্মহারা হয়ে বললাম,
‘আমি কী অনুবাদ করব? তোমার রোগী তো তোমার চেয়েও ভালো ইংরেজি বলছে।’
‘বলো কী? একথা তো আগে কেউ আমাকে বলেনি।’

এই রোগীর ইতিহাস আমার জানা নেই। তার সেই বিশাল বাড়িতে তাকে দেখাশোনা করার মত কেউ আছে কী না, হাসপাতালে তাকে কেউ দেখতে আসে কী না- কিছুই জানি না। এই প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিজের খরচে না কি সরকারী চিকিৎসা বিভাগের কোনো সীমাবদ্ধতার কারণে তাও বুঝতে পারছিলাম না।

এরপর তিনি ঝরঝরে ইংরেজিতে অনেক কথাই বললেন যার সাথে ডাক্তারের প্রশ্নের কোনো যোগসূত্রতা ছিল না। অতীতের অনেক কথা গল্প করলেন। এক ফাঁকে একথাও বললেন যে বাংলা সব শব্দ মনে করতে পারেন না, ইংরেজি বলতেই বেশি সহজ বোধ করেন।

আমি ডাক্তারের দিকে ফিরে বললাম, ‘হি ইজ নট আনসারিং ইয়োর কোয়েশ্চনস। হি ইজ মোর ইন্টারেস্টেড ইন টেলিং মি স্টোরিজ অফ হিজ লাইফ।’

অনেকদিন প্রাণখুলে কথা বলতে পারেননি বেচারা, তার চোখে মুখে আনন্দ যেন ঠিকরে পড়ছিল। এরকম বয়সের মানুষ দেখলেই আব্বা-মা’র কথা মনে পড়ে মনটা ভিজে একেবারে কাদামাটির মত নরম হয়ে যায়, পেশাদারিত্ব ভুলে যাই। হার্ট ফেইলিয়ার হয়ে মা একবার দুই সপ্তাহ সরকারী হাসাপাতালে ছিলেন, ওয়ার্ডের প্রচন্ড ময়লা মেঝেতে চাদর পেতে প্রতিরাতে আমি তার সাথে থাকতাম। আর এই লোকটা এই অত্যাধুনিক হাসপাতালের বিলাসবহুল কামরায় একেবারেই একা, তার কথাও কেউ বোঝে না। আমার ইচ্ছে হলো ডাক্তারকে বলি, আমাকে পয়সা দিতে হবে না। শুধু অনুমতি দাও, এই লোকটার সাথে সারাদিন বসে কথা বলি আমি।’

এপয়েন্টমেন্টের সময় শেষ হয়ে গেলে অনেক কষ্টে বিদায় নিতে হলো বৃদ্ধের কাছ থেকে। আমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, ‘ইউ আর অ্যান এক্সট্রিমলি ইন্টেলিজেন্ট এন্ড কাইন্ড গার্ল।’

গার্ল? এক ধাক্কায় বয়স কয়েক দশক কমিয়ে দিলেন বৃদ্ধ। খুশি হলেও ভাব বিনিময়ে অক্ষম এই বৃদ্ধকে হাসপাতালে একা ফেলে যাওয়ার কষ্টে ব্যথাতুর মন নিয়ে ঘরে ফিরলাম। জীবনে এই প্রথম এবং সম্ভবত শেষবারের মত ইংরেজিভাষী একজন ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করলাম। একে অনুবাদ তো বলে না অবশ্যই, কিন্তু ঠিক কী বলা যায় তাও আমার জানা নেই।



Shares