প্রচ্ছদ


হরতাল অবরোধমুক্ত রাজনীতিতে নির্বাচনী হাওয়া

31 December 2017, 14:31

নিজস্ব প্রতিবেদক
Share
This post has been seen 217 times.

সংঘাত ছিল না। ছিল না হানাহানি। হরতাল ছিল না। অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কোনো কর্মসূচিও ছিল না। তবে সমালোচনা ও বিরোধিতা ছিল। বিতর্কও ছিল। প্রধান বিচারপতির ছুটি এবং পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিতে কিছুটা উত্তাপ ছিল। প্রতিপক্ষ দমনে প্রশাসনকে ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকট। সব কিছু ছাড়িয়ে আলোচনায় ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপির জোট শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ ছিল। ছিল জোটের শক্তি বাড়ানো ও নতুন নির্বাচনী জোট গঠনের তৎপরতা। সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। অন্যদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণ নিয়েও আলোচনায় রয়েছে বড় দুই দল ও জোট। বছরজুড়েই আলোচনায় আছে বিএনপির অপ্রকাশিত নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা। বছরের মাঝামাঝি থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তবে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলা। সব কিছুর ঊর্ধ্বে বিদায়ী ২০১৭ সালকে বলা যায় হরতাল ও অবরোধমুক্ত রাজনীতির বছর।

বিদায়ী বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে সেনাবাহিনীর অভিযান, যাকে জাতিসংঘ বর্ণনা করেছে জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে।

বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। সুতরাং এ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি- সব ক্ষেত্রেই গণমানুষের প্রত্যক্ষও ইতিবাচক অংশগ্রহণই পারে আমাদের প্রত্যাশার পথে বাংলাদেশকে বিনির্মাণ করতে। এ জন্য জাতীয় সংসদের সরকারি ও বিরোধী দল উভয়কেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক হতে হবে। উভয় দলকে বিশ্বাস করতে হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনায়। এ ক্ষেত্রে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছুটা ঘাটতি ছিল। যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পরও আইনের মারপ্যাঁচে টিকে আছে দলটি।

বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে ৪০টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত আছে। তবে ক্ষমতার পালাবদলে বাংলাদেশে প্রধানত দুটি দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি সরকার পরিচালনা করেছে। মাঝখানে জাতীয় পার্টি স্বৈরাচারী কায়দায় ৯ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। সার্বিক হিসাবে বলা যায়, বাংলাদেশে দ্বিদলীয় শাসনব্যবস্থা বিরাজমান। তবে এ বছর প্রধান দুই জোটের বাইরে সমমনা ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে আরেকটি জোটের ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। এ ছাড়া বছর শেষে বি চৌধুরী, আ স ম রব, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে নির্বাচনী ‘যুক্তফ্রন্ট’ ঘোষণা করা হয়েছে।

আগামী সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার  জন্য দলকে প্রস্তুত করতে এ বছর সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এ পদক্ষেপে দলটি অনেকটাই সফল হয়েছে। গত এক বছরে আওয়ামী লীগের প্রতিটি বিভাগে বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা, জেলা কর্মিসভা, জেলা কমিটি অনুমোদন, কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের কাউন্সিল অধিবেশন সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো কর্তৃক ‘বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়াকেও দলের বিশাল অর্জন বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।

২০১৬ সালে বেশ কিছু জেলায় আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছিল না। তাছাড়া অনেক জেলায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তৃণমূল আওয়ামী লীগও বেশ এলোমেলো অবস্থায় ছিল। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বিভিন্ন জেলায় নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। গত বছরে এসব বিষয় মাথায় রেখেই সংশ্লিষ্ট জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল অনেকটা নিরসন করেছে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এ দলটি। তবুও এখনো কিছু জায়গায় কোন্দল রয়েই গেছে।

গত এক বছরে দেশব্যাপী শক্তিশালী সাংগঠনিক ঐক্য নিশ্চিত করার জন্য একটি তথ্যভান্ডার তৈরির কার্যক্রম চলছে। আওয়ামী লীগকে আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে জেলা/উপজেলা দলীয় কার্যালয়ের স্থায়ী/অস্থায়ী ঠিকানা ও ফোন নম্বর; জেলা/উপজেলা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম, আবাসিক ঠিকানা ও ফোন নম্বর; জেলা/উপজেলা প্রচার, উপপ্রচার, দপ্তর, উপদপ্তর, তথ্য ও গবেষণা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদকের নাম ও ফোন নম্বর সংগ্রহ এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

২০১৬ সালের মতো চলতি বছরেও বিএনপির উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন নেই। জাতীয় কোনো ইস্যুতেও আন্দোলন গড়তে পারেনি দলটি। জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়েও তারা ছিল নীরব। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখায় ঘুরপাক খেয়েছে বিএনপি। জাতীয় কোনো ইস্যুতে আন্দোলন গড়তে পারেনি দলটি। এক বছরে জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট নানা ইস্যুতে কোনো জোরালো প্রতিবাদ করেনি বিএনপি। অন্যদিকে তৃণমূল শক্তিশালীকরণে গত বছর অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। দুই বছরেও তৃণমূলের সবগুলো কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি দলটি। ২০১৫ সালে শুরু করে আজ পর্যন্ত সব কটি সাংগঠনিক জেলায় কমিটি দিতে পারেনি দলটি। তবে বছর শেষে নতুন বছরের বার্তা নিয়ে সারা দেশ সফর করেছে বিএনপির ৭০ টিম। নতুন বছরের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করতে গত মঙ্গলবার এসব টিম মাঠে নেমেছে। গতকাল তাদের সফর শেষ হয়। টিমগুলো স্থানীয়ভাবে কর্মিসভা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশনা তৃণমূলে পৌঁছে দেয়।

চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। নতুন ইসির অধীনে স্থানীয় সরকারের কয়েকটি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের পাশাপাশি দুটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়েছে। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে। বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু এবং বছরের শেষে অনুষ্ঠিত রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বিজয়ী হন।
দুই সিটির নির্বাচনেই ইসি বিতর্ক এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়েছে। সব দলের অংশগ্রহণে একটা নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ইসি। এ লক্ষ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে স্বাধীন এই সংস্থাটি। চলতি বছর সংস্থাটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সফল সংলাপ করেছে। সংলাপে প্রাপ্ত সুপারিশগুলোর ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণ করছে সংস্থাটি।

এদিকে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে চলছে বিতর্ক। বিএনপি চাচ্ছে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার। আওয়ামী লীগের মতে, বর্তমান সংবিধান অনুসারেই হবে নির্বাচন। এ নিয়ে চলছে রাজনীতিতে কথার খেলা। বিএনপি সরকারকে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তবে আশা ছাড়েনি। এ ছাড়া গত এক বছরেও দলটি সহায়ক সরকারের রূপরেখা প্রকাশ করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে বিএনপি অংশ না নিলেও সরকার নির্দিষ্ট সময়েই নির্বাচনের আয়োজন করবে।

কৌশলের ভিন্নতা থাকলেও সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ৩০০ আসনের জন্য ক্ষমতাসীনদের সাড়ে তিন হাজার সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। অন্যদিকে ৩০০ আসনের বিপরীতে সম্ভাব্য ৯০০ প্রার্থীর তালিকা করেছে বিএনপি।

কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নির্বাচনী আমেজ ফিরে এসেছে। টিভি টক শো থেকে চায়ের দোকান সর্বত্রই চলছে নির্বাচনী আলোচনা। আর এ আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য সাজার বিষয়টি। সাজা হলে খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন কি না- এ নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। যদিও এটা আইনের বিষয়। তবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতারা আগাম মন্তব্য করে বিষয়টিকে উসকে দিচ্ছেন।

চলতি বছর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। প্রধানমন্ত্রী দেশের ভেতরে যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই তিনি ‘নৌকার পক্ষে’ ভোট দেয়ার কথা বলছেন। তিনি উন্নয়ন কর্মকান্ড আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ারও আহ্বান জানাচ্ছেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়া এখনো ব্যস্ত মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে। কোনো না কোনো মামলায় তাকে প্রতি মাসেই কোর্টে হাজিরা দিতে হচ্ছে। তারপরও চলতি বছর বিভিন্ন ইফতার পার্টিতে ধানের শীষে ভোট চেয়েছেন। গত ১৪ জুন খালেদা জিয়া এক ইফতার মাহফিলে ধানের শীষে ভোট চেয়ে বলেন, সংসদ নির্বাচন একতরফাভাবে হতে দেয়া হবে না।

জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও চলতি বছর নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইসলামি সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের পাশাপাশি ৩০০ আসনেই দলীয় মনোনয়ন দেয়ার বাক্য আওড়াচ্ছে দলটি। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গেই শেষ সমঝোতা হতে পারে এরশাদের জাতীয় পার্টির।
সার্বিকভাবে বিদায়ী বছরটি রাজনীতিবিদদের জন্য ছিল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির বছর। এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ দৃশ্যত দল গোছানোর কাজে সাফল্য পেয়েছে। আর বিএনপির দৃশ্যমান কোনো সাংগঠনিক সফলতা নেই। তবে অদৃশ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করেছে। নতুন বছরে রাজনৈতিক দলগুলো মাঠ দখলের প্রতিযোগিতায় থাকবে।

সৌজন্যে: ভোরের কাগজ।

Share


Shares