প্রচ্ছদ


মোস্তাফা জব্বার ‘পাচ্ছেন’ টেলিকম-আইসিটি, নতুন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ৪জন

03 January 2018, 02:29

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 518 times.

নতুন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা নারায়ন চন্দ্র চন্দ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি মোস্তাফা জব্বার, লক্ষ্মীপুরের প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম শাহজাহান কামাল এবং রাজবাড়ীর সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী।

এদের মধ্যে প্রথম তিনজনকে মন্ত্রী এবং কাজী কেরামত আলীকে করেছেন প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে । মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের শপথ পড়ান। সরকার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।

খাদ্যমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এবং নতুন মন্ত্রীদের পরিবারের সদস্যরা অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন। মন্ত্রিসভার নতুন এই সদস্যদের বঙ্গভবনে নিয়ে যেতে বিকালে সচিবালয় থেকে পাঠানো হয় চারটি গাড়ি। শপথের জন্য বিকাল সাড়ে ৫টার মধ্যে তারা সবাই বঙ্গভবনে পৌঁছে যান।

শপথ পড়াতে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সঙ্গে নিয়ে দরবার হলে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে তিন মন্ত্রীর শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। পরে হয় প্রতিমন্ত্রীর শপথ।

শপথ নেওয়ার পর তিন মন্ত্রী টেবিলে বসে শপথবাক্যে স্বাক্ষর করবেন। প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়ে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন। পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। এই চারজনকে নিয়ে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা দাঁড়াল ৫৪। তাদের মধ্যে ৩৩ জন মন্ত্রী, ১৮ জন প্রতিমন্ত্রী এবং দুইজন উপমন্ত্রী।

এছাড়া মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের দায়িত্বে আছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে আছেন আরও পাঁচজন । ৭২ বছর বয়সী নারায়ন চন্দ্র চন্দ খুলনা-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনবার। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করলে তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

নতুন মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পরিচিত উদ্যোক্তা। ৬৮ বছর বয়সী জব্বার ২০০৭ সালের ২৬ মার্চ ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন। পরের বছর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার যুক্ত করে নেওয়া হয়। মন্ত্রিসভার আরেক নতুন মুখ শাহজাহান কামাল লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের সাংসদ। ৭২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপাতির দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। তার ভাই অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি।

৬৩ বছর বয়সী কাজী কেরামত আলী গত নির্বাচনে রাজবাড়ী-১ আসন থেকে চতুর্থবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য এবং সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটি সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সোমবার ওই চারজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে থাকতে বলা হয় শপথের জন্য। তারপরই গণমাধ্যমে তাদের নাম আসতে থাকে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম মঙ্গলবার বিকালে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “নাম যেভাবে আসছে, ঠিক আছে। তিনজন নতুন এবং একজন পুরনো। পুরনো থেকে একজন পূর্ণমন্ত্রী হবেন। আর দুজন নতুন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী, চারজন।

লতিফ সিদ্দিকীর আসনটাই পেতে যাচ্ছেন মোস্তাফা জব্বার। তিন বছর আগে বিদেশে এক বেসামাল উক্তির কারণে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছিলেন ডাক,তার , টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী । তারপর থেকে বিশাল এই মন্ত্রণালয় দুই অংশে দুজন প্রতিমন্ত্রী চালিয়েছেন ।ডাক,তার , টেলিযোগাযোগ এর প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলক ।

দীর্ঘ তিন বছর পর নতুন একজন মন্ত্রী পেতে যাচ্ছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় । তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার সেই দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন এমন একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে সোমবার বিকেল থেকেই । মোস্তাফা জব্বার বিজয় বাংলা কিবোর্ডের প্রবর্তক আনন্দ প্রিন্টার্স এবং আনন্দ মুদ্রায়ণের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি তিনি। এ দেশে অনলাইন নীতিমালা প্রণীত হয়েছে তারি হাতে । মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মোস্তাফা জব্বার।

একই অনুষ্ঠানে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা নারায়ন চন্দ্র চন্দ ও লক্ষ্মীপুরের সাংসদ এ কে এম শাহজাহান কামাল। এছাড়া রাজবাড়ীর এমপি কাজী কেরামত আলী শপথ নেন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। তাদের কে কোন দপ্তর পাচ্ছেন তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে বুধবার। তবে একাধিক সূত্র জানিয়েছে , মোস্তাফা জব্বার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন।

হজ নিয়ে মন্তব্যের কারণে ২০১৪ সালের অক্টোবরে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে সরিয়ে দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই ওই মন্ত্রণালয়ের দেখভাল করে আসছিলেন। আর প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আছেন আইসিটি বিষয়ে তার উপদেষ্টা হিসেবে।

সংসদ সদস্য না হওয়ায় মোস্তাফা জব্বার সরকারে এসেছেন চতুর্থ টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে। মন্ত্রিসভার পুরনো সদস্যদের মধ্যে ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিও টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী।

আটষট্টি বছর বয়সী মোস্তাফা জব্বার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অভিযাত্রার সঙ্গে আছেন শুরু থেকেই। প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সসহ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন কমিটিতে দায়িত্ব পালন করে আসা জব্বার বাংলাদেশ কপিরাইট বোর্ডেরও সদস্য। আনন্দ কম্পিউটার্সে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ২৬ মার্চ ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন জব্বার। পরের বছর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার যুক্ত করে নেওয়া হয়।

১৯৪৯ সালের ১২ অগাস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ থানার চর চারতলা গ্রামে জন্ম নেওয়া মোস্তাফা জব্বার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ওই সময়ই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

স্বাধীনতার পর সূর্যসেন হলের নাট্য ও প্রমোদ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন জব্বার। বাহাত্তরে ছাত্রলীগ ভেঙে দুই ভাগ হলে তিনি জাসদ ছাত্রলীগের অংশে যোগ দিয়েছিলেন । যুক্ত হয়েছিলেন জাসদের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত গণকণ্ঠ পত্রিকার সঙ্গে । ছাত্রজীবনে সাপ্তাহিক জনতায় লেখালেখিতে যুক্ত থাকা মোস্তাফা জব্বারের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল সাংবাদিকতা দিয়ে, সাপ্তাহিক গণকণ্ঠ পত্রিকায়। ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। গণকণ্ঠ বন্ধ হয়ে গেলে বিভিন্ন সময়ে ট্র্যাভেল এজেন্সি, মুদ্রণ ও প্রকাশনা ব্যবসায় যুক্ত হন জব্বার। ট্র্যাভেল এজেন্টদের সংগঠন আটাবের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন একসময়। ১৯৮৭ সালে তিনি কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবসায় প্রবেশ করেন এবং পরের বছর ১৬ ডিসেম্বর তিনি প্রকাশ করেন বিজয় বাংলা কিবোর্ড ও সফটওয়্যার। ডিজিটাল বিশ্বে বাংলা ভাষার আজকের অবস্থানে আসার পেছনে বিজয় কিবোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।  মোস্তাফা জব্বার জড়িত আছেন তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ক লেখালেখিতেও। বাংলাদেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে থাকা আইসিটি বিষয়ক বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক তিনি।

তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার কথকতা, ডিজিটাল বাংলা, একুশ শতকের বাংলা, বাঙ্গালী ও বাংলাদেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ, একাত্তর ও আমার যুদ্ধ এবং উপন্যাস নক্ষত্রের অঙ্গার। লেখালেখি ছাড়াও টেলিভিশনে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে আসছেন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সাবেক এই সভাপতি। তিনি বাংলাদেশ অনলাইন মিডিয়া এ্সোসিয়েশনেরও উপদেষ্টা ।


Shares