প্রচ্ছদ


শিক্ষা হোক জাগরণের পথ…

09 January 2018, 00:06

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 267 times.

ফেসবুক থেকে নেয়া, বনশ্রী দাশগুপ্তঃ শিক্ষা হলো দেশ ও সমাজ উন্নয়নের মূল ভিত্তি৷ নারী শিক্ষার মূল লক্ষ্য নারীকে সচেতন ও প্রত্যয়ী করা,সামাজিক, আর্থিক, সাংস্কৃতিক নানা কারণে এ দেশের দরিদ্র মানুষ যেমন বঞ্চিত হয়েছে তেমনি সর্বস্তরে বিপুল সংখ্যক নারীও এই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত৷ পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার, বৈষম্য ও নিপীড়নের বেড়াজালে সর্বদা নারীকে ঘিরে রাখা হয়েছে৷ এখন সময় এসেছে সম-অধিকারের অনুকূলে নারীর দৃষ্টিভঙ্গী প্রখর করা.আর সর্বস্তরে শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।
নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রথমেই আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে! কুসংস্কার ও দারিদ্রতা দূর করতে হবে। নারী কে স্বাবলম্বী করতে হলে শিক্ষার পাশাপাশি নারীকে আত্মনির্ভরশীল হওয়াটা ও জরুরী।
সর্বোপরি সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য এবংবৈষম্যহীন সমাজ গড়ার জন্য নারী শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। এটা অবধারিত সত্য যে, শিক্ষাক্ষেত্রের নারীর কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কখনই সম্ভব হবে না।

শিক্ষা চিন্তায় এক নতূন
আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন স্বামী
বিবেকানন্দ। তখনও আমাদের দেশ
স্বাধীন হতে অর্ধ শতাব্দী বাকী।

এই
সময়ে দাঁড়িয়ে অধ্যাত্ম শিক্ষাকে
হাতিয়ার করে বাংলা তথা ভারতের
শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আমূল পরিবর্তন
সাধনের মূলমন্ত্র শোনাতে চেয়েছিলেন
স্বামী বিবেকানন্দ। শিক্ষাব্যবস্থার
সামগ্রিক বিকাশ সাধনের জন্যে তিনি
বিভিন্ন দিক দিয়ে শিক্ষা সংস্কারের
কথা বলেন, সেটি যেমন শিক্ষার উদ্দেশ্য
বা প্রকৃতি নিয়ে, শিক্ষা পদ্ধতি কি হওয়া
উচিত তা নিয়ে তেমনি শিক্ষার ভিত্তি,
পাঠক্রম বা স্ত্রী শিক্ষার মতো অবশ্য
বিচার্য দিক, কোনটিই বাদ যায় নি।
ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষার হাল দেখে
কঠোর সমালোচনা করে বিবেকানন্দ
বলেছিলেন: যে শিক্ষায় জীবনে নিজের
পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারা যায়, সেই
হচ্ছে শিক্ষা। আজকাল এই সব স্কুল
কলেজে পড়ে তোরা কেমন একপ্রকারের
একটা dyspeptic জাত তৈরী হচ্ছিস।

শিক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর
অনুধ্যানের ফলেই স্বামীজী এই চরম
কথাটি বলতে পেরেছিলেন। শুধুমাত্র
পুঁথিগত বিদ্যার মাধ্যমে বড় বড় ডিগ্রি
নিয়ে সমাজের কোন্‌ মঙ্গল সাধন হতে
পারে যদি সেই বিদ্যার কোনো প্রয়োগগত
সাফল্য না থাকে? সেই বিদ্যাই কি প্রকৃত
শিক্ষা যা মানুষকে জীবনে প্রকৃত
দায়িত্বশীল, কর্মঠ ও স্বাবলম্বী হতে
সাহায্য করে না? তাই প্রকৃত শিক্ষা কি
তা ব্যাখ্যা করে স্বামীজী বলেছেন:
মানুষের মধ্যে যে পূর্ণতা স্বতই বর্তমান,
তাহারই বিকাশের নাম শিক্ষা।…শিক্ষা
বলতে আমি বুঝি যথার্থ কার্যকর জ্ঞান-
অর্জন; বর্তমান পদ্ধতি যাহা পরিবেশন
করে, তাহা নয়। আমাদের প্রয়োজন সেই শিক্ষার, যাহা দ্বারা চরিত্র গঠিত হয়,
মনের বল বৃদ্ধি পায়, বুদ্ধিবৃত্তি বিকশিত হয়, এবং মানুষ স্বাবলম্বী হইতে পারে। তাই পাশ্চাত্ত্য বিজ্ঞানের সহিত বেদান্তের সমন্বয়—ব্রহ্মচর্য, শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস হইবে সেই শিক্ষার মূলমন্ত্র। স্বামীজী বলেছেন উচশিক্ষা তথা শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিৎ জীবনের সমস্যাগুলির সমাধান করার সামর্থ্যলাভের যোগ্যতা। আর এই যোগ্যতা অর্জনের অন্তরতম অঙ্গ হল ধর্ম । ধর্ম বলতে তিনি সাধন-ভজন-পূজন-

আরাধনার বহিরঙ্গ আচার পালনের কথা বলেননি। এই ধর্ম হল আধ্যাত্মিকতা, যা মানুষের আত্মার শক্তির বিকাশ সাধন করে, নৈতিক জীবনের মান উন্নত করে অর্থাৎ সার্বিকভাবে মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটাতে সাহায্য করে। তিনি বলেছিলেন

আধ্যাত্মিক বিষয়ে আমরা জগতের প্রকৃত শিক্ষক কিন্তু স্বামীজীর নির্দেশিত অধ্যাত্মবাদ শুধু চোখ বুঁজে ধ্যান করা নয়,
তাঁর অধ্যাত্মবাদ শিক্ষা দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মানুষের দুঃখ-দারিদ্রের বিরুদ্ধে এবং ভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে—তাঁর অধ্যাত্মবাদ জীবনে এনে দেয় আত্মপ্রত্যয়,
যে আত্মপ্রত্যয়ের মূর্ত প্রতীক আমরা প্রত্যক্ষ করেছি নেতাজী সুভাষচন্দ্রের মধ্যে। অধ্যাত্মভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া এমনি আত্মপ্রত্যয়ের অধিকারী হওয়া যায় না। অধ্যাত্ম-বোধ বর্জিত শিক্ষাব্যবস্থায় দেশ আজ আবার এমন এক ধর্মবোধহীনতার পঙ্কপথে এগিয়ে চলেছে,
যা থেকে উদ্ধার পেতে হলে স্বামীজী-
নির্দেশিত শিক্ষানীতিকে গ্রহণ না করে উপায় নেই।

স্ত্রীজাতিকে শিক্ষার দ্বারা স্বাবলম্বী করতে না পারলে তাদের এই দুঃখ দুর্দশার অবসান সম্ভব নয়—
নারীগণকে এমন যোগ্যতা অর্জন করাইতে হইবে, যাহাতে তাহারা নিজেদের সমস্যা নিজেদের ভাবে মীমাংসা করিয়া লইতে পারে। তাহাদের হইয়া অপর কেহ এ কার্য করিতে পারে না, করিবার চেষ্টা করাও উচিৎ নহে। আর জগতের অন্যান্য দেশের মেয়েদের মতো আমাদের মেয়েরাও এ যোগ্যতা-লাভে সমর্থ।

তিনি চেয়েছিলেন বৈদিক বা ঔপনিষদিক যুগের নারীদের মতো এযুগের নারীদেরও সামাজিক অবস্থান পুরুষদের সমান হোক,
যদি নারী আর পুরুষ উভয়েরই জীবন সমভাবে উন্নত না হয় তবে দেশের বা জগতের সর্বাঙ্গীন উন্নতি সম্ভব নয়, কারণ
এক পক্ষে পক্ষীর উত্থান সম্ভব নহে।

ব্যবহারিক জগত ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তিনি পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোন ভেদ করেননি। দৃঢ় কন্ঠে তিনি বলেছিলেন,
আমি পুরুষগণকে যাহা বলিয়া থাকি,
নারীগণকে ঠিক তাহাই বলিব। ভারত এবং ভারতীয় ধর্মে বিশ্বাস কর,
তেজস্বিনী হও, আশায় বুক বাঁধো, ভারতে জন্ম বলিয়া লজ্জিত না হইয়া উহাতে গৌরব অনুভব কর…।

তিনি প্রাচ্য নারীর মাতৃরূপ এবং পাশ্চাত্ত্য নারীর জায়ারূপের সংমিশ্রনে এক আদর্শ নারী চরিত্র সংগঠন করতে চেয়েছিলেন—
প্রাচ্যের অধ্যাত্মশক্তি ও পাশ্চাত্ত্যের কর্মশক্তির মিলন। তিনি আমেরিকা গিয়ে নারীদের শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থান দেখে চমৎকৃত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন নারীর যথার্থ অভ্যুদয় তখনই ঘটবে যখন প্রাচ্যের অধ্যাত্মশক্তি তার সঙ্গে যুক্ত হবে। তাঁর নারী জাগরণ ও স্বামী বিবেকানন্দ প্রবন্ধে প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা স্বামীজীর স্ত্রীশিক্ষার এই আদর্শের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, স্বামীজী এই ধারণা পোষণ করতেন যে, অতীত যুগে যে সব মহীয়সী নারী জন্ম গ্রহণ করেছেন, আগামীকালের নারীর মহত্ত্ব তাঁদের কীর্তিকে অতিক্রম করে যাবে। আগামী যুগের নারীর মধ্যে থাকবে একাধারে বীরোচিত দৃঢ় সঙ্কল্প ও জননীর স্নেহকোমল হৃদয়। নারী হবে পবিত্রতা, শক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক।
সর্বোপরি, তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিছু সংখ্যক শিক্ষিতা মেয়ে যেন আজীবন ব্রহ্মচর্যব্রত গ্রহণপূর্বক পবিত্র ও আদর্শ জীবন গ্রহণ করে। আধ্যাত্মিক পূর্ণতালাভই হবে তাদের জীবনের উদ্দেশ্য এবং তারাই গ্রহণ করবে মেয়েদের শিক্ষার ভার।
স্বামীজী স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষে বসে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন যা ভারতবর্ষকে তার প্রাচীন ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে এবং এক নতুনতর উন্নত জীবনধারার দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। সেইজন্য তিনি শিক্ষার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী হবে, তার শিক্ষণ পদ্ধতি কী হবে এবং পাঠক্রম কী হবে সব বিষয়েই নিজের সুচিন্তিত মতামত জ্ঞাপন করেছেন। ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার ওপর ভিত্তি করে যে শিক্ষাদর্শের পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন তা শুধুমাত্র ভারতবর্ষ নয় সমগ্র মানবজাতির উন্নতির জন্য পরিকল্পিত।

নারীশিক্ষার বিস্তারের জন্য তাঁর প্রবর্তিত পথই স্বাধীনতা-উত্তর শিক্ষা পরিকল্পনা ও শিক্ষা কমিশনের সুপারিশে আমরা দেখতে পাই। স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষা সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়নের প্রতিই অধিক দৃষ্টিপাত করার কথা বলেছেন। আর তার জন্য প্রয়োজন সমাজ সচেতন ছাত্র-দরদী এক শিক্ষক গোষ্ঠী। এই শিক্ষক সম্প্রদায়ই সম্প্রসারণ সেবা (এক্সটেনশন সার্ভিস)-এর মাধ্যমে সামাজিক শিক্ষার প্রসার করবেন। তবেই এক উন্নত, রুচিশীল,

মার্জিত, দৃঢ়চিত্ত, চরিত্রবান, শরীর ও মনের দিক দিয়ে স্বাবলম্বী এক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সৃষ্টি হোক।।


Shares