প্রচ্ছদ


কোন ভাবের ভাবুক তিনি, তিনিই জানেন…

19 January 2018, 14:48

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 308 times.

অম্বরীষ দত্ত এর ফেসবুক থেকে নেয়াঃ  শুদ্ধাচারী বৈষ্ণব নন মোটেও- গৌড়ীয় বৈষ্ণব বিধানে। অন্য কোন বৈষ্ণব ধারায়ও তাঁকে ব্র্যাকেটবন্দী করা যায়না- যেটুকু জানা যায় তাঁর সম্বন্ধে, বোঝা যায় তাঁর রচনায় অবগাহন করলে।

আদ্যোপান্ত বৈষ্ণব ভাবে তিনি বিভোর…… অথচ ত্যাগী বৈষ্ণব নন, সংসার করেছেন আবার পুরোপুরি গৃহীও থাকতে পারেননি, গৃহত্যাগ আর হাওরে ডেরা বেঁধে বসবাস, সাধন ভজন ইঙ্গিত দেয় সহজ সাধনার অথচ সহজিয়াও তিনি নন, বাউলের বৈশিষ্ট আছে, সম্পন্ন উচ্চ বংশীয় ভদ্র ঘরের সন্তান ঘুরে বেড়াচ্ছেন এগ্রাম থেকে ওগ্রামে, গান বাঁধছেন মুখে মুখে, গাইছেন, চেলারা হাঁটছে সাথে, আউল বাউলের স্বভাব, সাধন ধারাটা যে কি বোঝা যাচ্ছে না কিংবা তাঁর গানেও খুব স্পষ্ট হচ্ছে না তা অর্থাৎ বাউল বলে আমরা যে আলাদা একটা লোক সম্প্রদায়ের ভিতরে থাকা সাধন পদ্ধতি বুঝি, সে ধারার সাধক বলেও তাঁকে বিশেষায়িত করা যাচ্ছে না, অতএব বলাই যায় বাউলও তিনি নন । কি তকমায় ভূষিত করি তাঁকে ! জীবনাচারের নানা বিষয়াদি বিবেচনায় নিলে ধারনা করা যায় তিনি এক চেতনা বিচ্যুত গৌড়ীয় ভাবের গৃহী বৈষ্ণব .. এবং ভাবস্রোতে গৃহবিচ্যুতও বটে- আর ওই বিচ্যুতিটাই তাঁকে তৈরি করেছে, নিজ ভাবে, নিজস্ব বোধে, স্বাধীনভাবে ; মগ্ন হয়েছেন নিজস্ব সাধন ভাবনায়, তাড়িত হয়েছেন গান রচনায়। আবার তাঁর গানগুলোই দিব্যি গীত হচ্ছে, হয়ে আসছে শত বছর ধরে, সিলেট অঞ্চলের প্রায় সমস্ত বৈষ্ণব আখড়া আশ্রমে, কীর্তনে, কীর্তন আসরে…… যে অর্থে বৈষ্ণবীয় কীর্তনের ধারায় ‘মহাজনী পদ’ বিবেচিত হয়, যে অর্থে বিদ্যাপতি, জয়দেব, চণ্ডীদাস , জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, নরোত্তম দাস, বৃন্দাবন দাস মহাজন, সে অর্থে তিনি ‘মহাজন’ বিবেচিত হন না, অন্ততঃ আমাদের দেখা সময়ে হতেন না মূলধারার বৈষ্ণব সমাজে কিংবা হলেও খণ্ডিত পরিসরেই হতেন, সারা বাংলায়তো একেবারেই নন্‌… কিন্তু কখনই তাঁকে অবজ্ঞা করা যায়নি, হয়ওনি… তিনি সদম্ভেই হাজির থেকেছেন, গীত হয়েছেন, আনন্দে মাতিয়েছেন, প্রেমে ভাসিয়েছেন- অশ্রুতে মিলনে।

আর এই ধর্ম সাম্প্রদায়িক চেতনার বাইরের তিনিতো গানের ভুবনে সিলেট অঞ্চলের মহারাজ, সামাজিক হেন কোন অনুষ্ঠানাদি নেই, ক্রিয়াদি নেই, ব্রত পার্বণ নেই, কি নাগরিক সমাজ কি লোক সমাজ- বৃহত্তর সমাজে, তাঁর গান নিয়েই যেন উৎসবের সর্বজনীনতা, পরিপূর্ণতা- উৎসব উদযাপন। পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থায়, মেয়েরা গান গাইছেন, ঘরে কিংবা ঘরের দাওয়ায়, নৃত্য করছেন মহিলারা দল বেঁধে উৎসব বাড়ীর উঠোনে, পুজো মণ্ডপেও কখনোবা, সেতো তাঁরই গান, প্রায় এককভাবেই, প্রচণ্ড প্রভাব ফেলেছে সমাজে মেয়েদেরকে ‘গান’-এর জগতে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে সামাজিক ঘেরাটোপ ভেঙ্গে… সিলেটের বাইরের বাংলা সমাজেও তিনি আছেন, ক্ষীনস্রোতা।

গানের বিশাল ভাণ্ডার তাঁর, লোক ধারার সিলেটী গানের প্রাণপুরুষ তিনি, ধামাইল শব্দটা উচ্চারিত হলেই এক শান্ত সৌম্য সরল চেহারা ফুটে উঠে আমাদের মনে… রাধারমণ, রাধারমণ দত্ত… তকমা লেগে গেছে ‘ভাইবে রাধারমণ’ …… রচনার ভনিতাও নামের অঙ্গ হয়ে গেছে, কী অসাধারণ এই পরিচিতি ।

এসব আমার নিজের দেখা জীবনের অভিজ্ঞতা শুধু, ‘মহাজনী পদ’…… নিয়ে ভাবতে ভাবতে।

আধুনিক ভাবনার জগৎ, আধুনিক চিন্তার জগৎ, আধুনিক ব্যাখ্যার ধারা, আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি… নিশ্চয়ই আধুনিক চেতনা প্রসূত হবে, যৌক্তিক এবং নির্মোহ চিত্তে বিবেচিত হবেন তিনি- রাধারমণ দত্ত এবং কেবলই কতিপয় গান নয়, গানের আঙ্গিক নয়, খণ্ডিত ভাবনা বলয় ভেদ করে আলোচিত হবেন, উন্মোচিত হবেন- তাঁর সময়,তাঁর সমাজ,তাঁর শ্রেণী অবস্থান, সামাজিক ধর্ম চেতনা, লোক মানস, নারীভুবন ইত্যাকার নানাবিধ চিন্তা অনুষঙ্গের সামগ্রিকতায়। বৈষ্ণব ধর্ম আসরে কতটা ‘মহাজন’ তিনি, কিংবা আদৌ তা নন, কিইবা এসে যায়, বিবেচ্য নয় মোটেও ; আকাশটা বিস্তৃত অনেক, শেষমেষ মানুষই আবিস্কার করবে কোন সে ভাবের ভাবুক তিনি, আর কাল পরিক্রমায় মানুষই নির্ধারণ করবে কতটা ‘মহাজন’ তিনি, কতটা তা নন – ‘ভাইবে রাধারমণ’ ।


Shares