প্রচ্ছদ


সব্জি বিক্রির টাকায় হাসপাতাল গড়ে ‘পদ্মশ্রী’ সুভাষিণী

27 January 2018, 16:28

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 252 times.

পার্ক সার্কাসের ব্রিজের নীচে সব্জি বিক্রি করে, পুকুর পরিষ্কার করে, পরিচারিকার কাজ করে তিল তিল করে জমিয়েছিলেন টাকা । সেই অর্থেই গড়ে তুলেছেন দাতব্য হাসপাতাল । সেই বঙ্গতনয়া সুভাষিণী মিস্ত্রিকেই এবার পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করল ভারত সরকার । বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ১২ বছর বয়সে । ২৩ বছর বয়সে উপযুক্ত চিকিতসার অভাবে হারাতে হয়েছিল স্বামীকে । ১১ বছরের দাম্পত্য জীবনে কোলে এসেছে চার সন্তান । স্বামীর মৃত্যুশোক বড় শোক । সেই শোক সামলাবেন, নাকি ৪ সন্তানকে মানুষ করবেন ! – এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ভেঙে পড়েননি সুভাষিণী দেবী ।

দৃঢ় সংকল্প নিয়েছিলেন চোখের সামনে আর কোনও ব্যক্তিকে যাতে বিনা চিকিৎসায় প্রাণ খোয়াতে না হয় । মনে মনে পণ করলেন হাসপাতাল গড়বেন । সেই হাসপাতালে গরিবের চিকিৎসা হবে বিনে পয়সায় । ৭৩ বছর বয়সী সুভাষিণি মিস্ত্রির লড়াই শুরু হয়েছিল সেই অর্ধ শতক আগে থেকেই । তিনি এমন একজন মা, যিনি মানবকল্যাণের স্বার্থে বাজি রেখেছেন গোটা জীবন । লোকের বাড়ি বাসন মেজেছেন, সবজি বিক্রি করেছেন, দিন মজুরি করেছেন, লোকের জুতো পালিশ করেছেন দিনের পর দিন । মাথা নত করেছেন সারাজীবন মাথা উঁচু করে বাঁচবেন বলে । যেটুকু উপার্জন করেছেন, সিংহভাগটাই চলে গেছে হাসপাতাল তৈরির কাজে । সালটা ১৯৯৩ । জমানো টাকায় হাসপাতাল বানানোর জন্যে কলকাতার শহরের বাইরে ১ বিঘা জমি কিনে ফেললেন সুভাষিণী দেবী । অনেক কম দামে । জায়গাটি কলকাতার কাছাকাছি একটি গ্রামে, হাঁসপুকুর । সবসময় সেই নীচু জায়গায় জল জমে থাকে । পুরো জলা জায়গা । সুভাষিণী নিজে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে মাটি ফেলে সেই জায়গাকে বাসযোগ্য করেছেন ।

১৯৯৬ সালে সেখানে গড়ে উঠল হাসপাতাল । নাম দেওয়া হল হিউম্যানিটি হাসপাতাল ‘হিউম্যানিটি হসপিটাল’ । হাসপাতাল খোলার প্রথম দিনই ২৫২ জন রোগীর চিকিৎসা হয়েছিল সেখানে । আজও নিত্যদিন ওই হাসপাতালে বহু মানুষের চিকিৎসা করা হয় বিনা খরচে । এমন একটি হাসপাতাল, যেখানে রোগীকে সামান্য অসুখের জন্যে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করতে হয় না । কোনও কারণ ছাড়া এটা পরীক্ষা, সেটা পরীক্ষা করতে হয় না । যেখানে চিকিৎসা হয় আগে । ফর্মের সই করে, টাকা জমা দিয়ে তবেই হবে চিকিৎসা- এমনটা এখানে চলে না । ন্যূনতম খরচে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে । সবই একজন মায়ের পরিশ্রমের ফল । সেই মা আর কেউ নন, ঠাকুরপুকুর বাজারের কাছে হাঁসপুকুরের সুভাষিণী মিস্ত্রি । স্বপ্নকে উড়ান দিতে জীবনের সমস্ত পুঁজি ঢেলে দিয়েছেন তিনি । লোকের বাড়ি আয়ার কাজ করেছেন । ধুলোয় বসে সব্জি বিক্রি করেছেন। উপার্জন সামান্য কয়েকটা টাকা । দিন মজুর হয়ে কাজ করেছেন । প্রতিদিন ১ টাকা ২৫ পয়সা রোজগার ছিল তখন । পুরো টাকাটাই জমিয়ে রেখেছিলেন । তবুও হেরে যাননি । পরিস্থিতির কাছে মাথা নত করেননি একবারও । এক টাকা, দুটাকা করে জমিয়ে ১০ হাজার টাকা দিয়ে জমি কিনেছেন । গ্রামের মানুষের কাছ ৯২৬ টাকা চাঁদা তুলেছেন, কাদামাটি, বাঁশ টালি দিয়ে গড়েছেন হাসপাতাল।

সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করেছেন । চার সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে অজয় লেখাপড়া করেছিলেন অনাথ আশ্রমে থেকে । সেই অজয় আজ মা সুভাষিণী দেবীর হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক । বর্তমানে অজয় বাবুকে নিয়ে নিয়ে ডাক্তারের সংখ্যা ১২জন । ৪৫টি বেড রয়েছে । একইসঙ্গে রয়েছে ১০টি আইসিইউ । হাসপাতালকে আরও বড় করার জন্য বেশ কয়েকজন সহৃদয় ব্যক্তি এগিয়ে এসেছেন । আশপাশে আরও ২ বিঘা জমি কেনা হয়েছে । সাংসদ মালিনী ভট্টাচার্যর কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছিলেন ‘হিউম্যানিটি হাসপাতালের’ প্রতিষ্ঠাতা সুভাষিণী মিস্ত্রি । সেই মহিয়সী মহিলার হাতেই এবার উঠতে চলেছে ‘পদ্মশ্রী সম্মান’ ।


Shares