প্রচ্ছদ


পৌরাণিক কাহিনী ”দেবযানী প্রথম পর্ব”

04 March 2018, 02:19

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 413 times.

মালবিকা সরকার’র ফেসবুক থেকেঃ কিশোরী দেবযানী খুব ভোরে ফুল তুলছে। মগডালে অনেক ফুল, সে কিছুতেই তুলতে পারছে না। বার বার লাফ দিচ্ছে। সে যখন হতাশ প্রায়, তখন কে যেন গাছের ডালটা নিচু করে ধরলো। সে সব ফুল তুলে হাসি মুখে পিছন ফিরে দেখে, অপূর্ব সুন্দর সদ্য যুবক একজন হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দেবযানী চিনতে পারে না, বলে, “কে তুমি? আগে তো তোমাকে দেখি নাই! কোথা থেকে, কি জন্য এসেছ? “যুবক বলে, “আমি বৃহস্পতি পুত্র কচ! স্বর্গ থেকে এসেছি, তোমার বাবা শুক্রাচার্যের কাছে শিক্ষা গ্রহন করতে এসেছি । কিন্তু ভয় পাচ্ছি উনি অসুরদের শিক্ষাগুরু আমাকে শিষ্য করে নাও নিতে পারেন। ” দেবযানী হেসে বলে, “আমার বাবা আমার সব কথা রাখেন, আমি বললে উনি নিবেন, তোমাকে শিষ্য করে।”এই বলে দেবযানী যায় তার বাবার কাছে বাবাকে বলে, “বাবা একটা চাওয়ার ছিল দিবেন কি?” শুক্রাচার্য বলেন, ” তুমি চেয়েছ আর আমি দেই নাই এমন কি কখনওই হয়েছে দেবযানী? বলো, কি চাও।” দেবযানী বলেন, ” বৃহস্পতি পুত্র কচ আপনার কাছে শিক্ষা গ্রহন করতে এসেছে তাকে শিষ্য করে নেন পিতা।” শুক্রাচার্য বলেন , “আমি অসুর গুরু দেবতাদের শিষ্য করে নেই না। তুমি বলছ তাই তাকে ডাকো আমি শিষ্য করে নিব। “
কচ, বৃহস্পতি পুত্র! সে দেবতা। দেবতারা বার বার অসুরদের কাছে পরাজিত হয়। কারণ অসুরদের গুরু শুক্রাচার্য জানতেন সঞ্জীবনী বিদ্যা। একমাত্র উনিই জানতেন। তাই দেবতারা কচকে পাঠায় সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখতে। তবে দেবতাদের জানতো সহজে শুক্রাচার্য এই বিদ্যা শিখাবেন না কোন দেবতাকে। আর দেবযানী অসুরগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা।

কচকে শিষ্য করে নিলেন শুক্রাচার্য।
এর পর কেটে গেলো অনেক বছর। কচের শিক্ষা গ্রহণ শেষ, এসেছে বিদায়ের দিন। সবার কাছে বিদায় নেয়া শেষ, সব শেষে আসে দেবযানীর কাছে। বলে, ” বিদায় দাও দেবযানী , আজ তোমার জন্য আমার শিক্ষা শেষ হলো। যদি তুমি না থাকতে তো আমি পারতাম না এই শিক্ষা নিতে আমাকে কবে অসুররা মেরে ফেলতো। পিতা, মাতা, বন্ধু ছাড়া এইখানে তুমি ছিলে আমার একমাত্র ভরসা। তাই তোমার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি আর এসেছি বিদায় নিতে। ” দেবযানী শান্তকন্ঠে বলে শুধু “কৃতজ্ঞতা! আর কিছু বলার নাই কিছু মনে নেই তোমার।” কচ চুপ করে থাকে। দেবযানী বলে, ” তুমি সব ভুলে গেছ, সব? মনে পরে তুমি যখন আমাদের গরু চড়ায়ে ক্লান্ত হয়ে যেতে তোমাকে গিয়ে আমি গা মুছে তোমাকে বাতাস করতাম। দৈত্যরা তিন বার তোমাকে মেরে ফেলতে ধরেছিল, আমি ঠিক তোমাকে রক্ষা করেছি। তোমার সব সময় যতোটা পারি যত্ন করে খাওয়াইতাম। আতিথ্যের কমতি রাখি নাই। সেই সব কি ভুলে গেছো? আচ্ছা সে না হয় থাক আমি কি করেছি। তুমিও তো আমার ফুল তোলার সময় হলে পাঠ ফেলে আমাকে ফুল পেরে দিতে। আমি যখন গাছে জল দিতাম, তুমি এসে আমাকে জল তুলে দিতে। আমার জন্য দূর দুরান্ত থেকে পদ্ম ফুল নিয়ে আসতে ।প্রতি সন্ধ্যায় স্বর্গ থেকে শিখে আসা গান আমায় শুনাতে। কেন করতে? এইগুলি কি কৃতজ্ঞতা ছিল, না আমার পিতার কাছে শিক্ষা নেওয়ার জন্য আমাকে ভালোবাসার অভিনয় ছিল? তাহলে নদী তীরে বসে কতো দিন কতো বিকাল আমরা গল্প করতাম তা কেন?” কচ বলে, “না, যা করেছি ভালোবেসেই করেছি। তাতে কোন ছলনা ছিল না।

মালবিকা সরকার।

আমি ভালোবাসি দেবযানী ।” দেবযানী বলে, ” হ্যাঁ, আমিও দেখেছি তোমার চোখে ভালোবাসা। বার বার দেখেছি। তো কেন আজ চলে যাচ্ছ আমাকে ফেলে? ” চোখে জল আসে দেবযানীর। দেবযানী বলে, “এসো আমরা এখানে একসাথে থাকি। আমরা সুখের সংসার গড়ি। কচ চোখের জল দেখে কষ্ট পায়। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দেবযানীকে বলে সে নিরুপায়! সে স্বর্গ থেকে এই প্রতিজ্ঞা করে এসেছে যে, সে সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখে যাবে। তার শিক্ষা শেষ। এখন তাকে যেতে হবে এটা তার কর্তব্য। স্বর্গেও কাউকে নিয়ে যাওয়া যায় না। আর তার কর্তব্য তাকে পালন করতেই হবে। তার ব্যক্তিগত সুখ কে বিসর্জন দিতে হবে। সে দেবযানীকে নিয়ে এখানে সুখের সংসার গড়তে পারবে না। দেবযানী চিৎকার করে বলে, ” তোমরা পুরুষ! তোমরাই বুঝি পারো ভালোবাসা শিখাতে, ভালোবাসতে, স্বপ্ন দেখাতে আবার সময় মতো নিজের দায়িত্ব কর্তব্য দেখিয়ে চলে যেতে। ” কচ করুণ স্বরে বলে, ” অনেক অভিমান করেছ, তাই বুঝছ না আমাকে আমাকে একবিশেষ কারনে এখানে পাঠানো হয়েছিল । এই বিদ্যা শিখে আমাকে যেতে বলা হয়েছে। আমি বাধ্য।” দেবযানী ক্ষেপে যায় বলে, “ও তার মানে তুমি আমাকে ব্যাবহার করে পিতার কাছে শিক্ষা গ্রহন করেছ? আমি শুক্রাচার্যের মেয়ে আমি তোমাকে তো ছাড়ব না! আমার অভিশাপ তোমার লাগবে। আমি অভিশাপ দিব তোমাকে। ” কচ বলে,” আমার মন জানে দেবযানী আমি কতো ভালোবাসি তোমাকে। কিন্তু এ কথা বললে আজ তুমি বিশ্বাস করবে না আর। দাও কি অভিশাপ দিবে। ” দেবযানী রেগে বলে বলে, ” অভিশাপ, তোমার প্রাপ্য তুমি শুধু প্রয়োজনে আমাকে ব্যবহার করেছ। নাও অভিশাপ দিলাম, যে বিদ্যার জন্য আর তুমি আজ আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ সেই বিদ্যা তোমার কখনওই কোন কাজে লাগবে না। তুমি নিজের জন্য কখনই এই বিদ্যা ব্যবহার করতে পারবে না। তবে তুমি এই বিদ্যা শিখাতে পারবে। ” কচ মাথা নিচু করে বলে, “ঠিক আছে নিলাম তোমার অভিশাপ! ” মাথা নিচু করে চলে যায় কচ। আর দেবযানী অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকে, যেভাবে মানুষ তাকিয়ে থাকে প্রবঞ্চকের দিকে!


Shares