প্রচ্ছদ


অয়নচলন…..

05 March 2018, 16:24

বহ্নি চক্রবর্তী
This post has been seen 490 times.

বহ্নি চক্রবর্তীঃ আজ থেকে ১৩ হাজার বছর পরে বাংলা ক্যালেণ্ডারে মাসের সঙ্গে ঋতুর সম্পর্ক বিপরীত হয়ে যাবে (যথা আশ্বিন মাসে বসন্ত আর চৈত্র মাসে শরৎ ঋতু হবে)।

প্রশ্ন : কেন এমন হবে ? বাংলা মাসগুলি ঋতুনিষ্ঠ নয় কেন ?

উত্তর : এটা হয় ক্রান্তিবৃত্তের ভিতর দিয়ে বিষুববিন্দুদ্বয়ের পশ্চিমাভিমুখে ধীর গতিতে চলনের জন্য, যার মান ৭০ বছরে প্রায় ১ ডিগ্রী হয় । এর ফলে বাংলা ক্যালেণ্ডারে ঋতুরা ৭০ বছরে একদিন, কিঞ্চিদধিক ২০০০ বছরে এক মাস, ১৩০০০ বছরে প্রায় ৬ মাস পিছিয়ে আসে । আজ থেকে ২৬০০০ বছর পরে পুনরায় আশ্বিন মাসে শরৎ ঋতু হবে ।

প্রাচীন ভারতীয় ও গ্রীক জোর্তিবিজ্ঞানীরা ভালোভাবে আকাশ পর্য্যবেক্ষণের ফলে অয়ন চলনের বিষয়টা (ক্রান্তিবৃত্তের পথ ধরে বিষুববিন্দুদ্বয়ের গতির ব্যাপারটা) জানতেন। কিন্তু, তার কারণটা নিউটনের আগে কেউ বুঝতে পারেননি । পৃথিবীর স্ফীত নিরক্ষীয় অঞ্চলের উপর সূর্য্য-চন্দ্রের টানে ফলে পৃথিবীর মেরুদণ্ডটা তার কক্ষতলের উপর অঙ্কিত লম্বের চারদিকে ২৬০০০ বছরে একটি শঙ্কু রচনা করে বলেই এটা হয় । ঘূর্ণনবেগ কমে আসা, একটা লাটিম যেমন হেলে গিয়ে মাথা চালে, পৃথিবীর এই গতিও সেই রকম । এর ফলে আকাশের মেরুতারাগুলিও বদলায় । বর্ত্তমানে যে তারাটি ধ্রুবতারা, মিশরের পিরামিডগুলি নির্ম্মাণের সময় সেই তারাটি যে ধ্রুবতারা ছিল না (থুবন নামের অন্য একটি তারা তখন ধ্রুবতারা ছিল)। এর থেকে এবং আরও নানা প্রমাণ থেকে পৃথিবীর অয়ন চলনের সত্যতা প্রমাণিত হয় ।

বিষয়টার পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করেছেন স্যার আইজ্যাক নিউটন, তাঁর গতিসূত্র ও মহাকর্ষ সূত্রের সাহায্যে । পৃথিবীর এই মাথাচালার পর্য্যায়কালটা যে ২৬০০০ হবে তাও নিউটনের সূত্রের সাহায্যে হিসাব করে দেখানো যেতে পারে ।

অবশ্য ইতোমধ্যে যদি বাংলা ক্যালেণ্ডারের বর্ষমানকে ২০মিনিট কমিয়ে (অধিবর্ষের সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে সেটা করা সম্ভব), গ্রেগরিয়ান ক্যালেণ্ডারের বর্ষমানের সমান করে দেওয়া যায় তাহলে পৃথিবীর অয়ন চলন ঘটলেও বাংলা মাসগুলি বরাবারই ঋতুনিষ্ঠ থাকবে; (যথা আশ্বিনে চিরকাল শরৎ থাকবে) । গ্রেগরিয়ান ক্যালেণ্ডারে বর্ষমান বঙ্গাব্দের চেয়ে ২০ মিনিট কম বলে জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী প্রভৃতি মাসগুলি বরাবর ঋতুনিষ্ঠই থাকে (যথা জানুয়ারীতে বরাবর শীতকাল) । ১৫৮২ খ্রীষ্টাব্দে পোপ ষোড়শ গ্রেগরির আমলে ইউরোপে এই পঞ্জিকা সংস্কার করা হয়েছিল । এদেশের পঞ্জিকাকারেরা বঙ্গাব্দেও এইরকম সংস্কার করার বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে পারেন ।

সঙ্গের ছবিতে ড্রাকো তারা মণ্ডলে অবস্থিত ক্রান্তিবৃত্তের উত্তর মেরুকে কেন্দ্র করে ২৩.৫ ডিগ্রী ব্যাসার্ধের বৃত্ত বরাবর ২৬০০০ বছরে খ-গোলের উত্তর মেরুর এক পাক খাওয়াটা বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে । পৃথিবীর মেরুরেখাটি যখন যে তারার কাছে গিয়ে পড়ে তখন সেই তারাটিই ধ্রুবতারা (pole star) হয় । পৃথিবীর ঘূর্ণাক্ষের উপর অবস্থান করার জন্য ঐ তারাটিকে স্থির বলে মনে হয় অন্য তারাগুলিকে তার চারদিকে ঘুরতে দেখা যায়; (তারকাদের দৈনিক ঘূর্ণন)। কয়েক হাজার বছর ধরে দেখলে ধ্রুবতারা ধীরে ধীরে পাল্টায় । ছবিতে দেখুন যে ১৪০০০ খ্রীষ্টাব্দে অভিজিৎ ধ্রুবতারা হবে ।

এই বিষয়টি ভাল করে না বুঝার ফলে Concise Oxford Dictionary-তে অধিবর্ষের ও tropical year-এর সংজ্ঞায় কেমন ভুল হয়েছে তা অন্যত্র (আমার টাইমলাইনে) বলেছি ।

তথ্য সূত্র : বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণচরিত্র’, যোগেশচন্দ্র রায়বিদ্যানিধির ‘পূজাপার্ব্বণ’ এবং বর্ত্তমান লেখকের ‘প্রাথমিক জ্যোতির্বিজ্ঞান’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলি থেকে।


Shares