প্রচ্ছদ


নারী খেলোয়াড়রা বৈশম্যের শিকার

06 March 2018, 23:07

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 292 times.

একশনএইড বাংলাদেশঃ  জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নারী খেলোয়াড়রা বাংলাদেশের জন্য নানা অর্জন নিয়ে আসলেও তার যথাযথ মূল্যায়ণ পান না। উল্টো নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন নারী খেলোয়াড়রা। আবার সরকার, পৃষ্ঠপোশক, পরিবার কিংবা সমাজ থেকে আর্থিক, সামাজিক কিংবা উন্নয়নগত সহযোগিতা পান না নারী খেলোয়াড়রা। যে কারণে নারীরা ক্রীড়া ক্ষেত্রে আসতে উৎসাহিত হন না।

মঙ্গলবার ঢাকার ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটে একশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ক্রীড়াঙ্গনে নারী: সংগ্রামে, মুক্তিতে’ এমন কথা বলেন আলোচকরা।

দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম ও শহরে কাজ করতে গিয়ে একশনএইড বাংলাদেশ দেখেছে নারী এবং কিশোরীদের ক্ষমতায়নে ক্রীড়া অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে এবং ভষ্যিতেও করবে। এর মাধ্যমে জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণ এবং প্রথাগত ধারণাকে ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব। তবে বাস্তবতা হলো একজন নারী বা কিশোরী খেলোয়াড়কে নানা ধরনের বৈষম্য ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। একইসঙ্গে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে একজন খেলোয়াড়, রেফারি, ধারাভাষ্যকার, ক্রীড়া সাংবাদিক জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হন। এতসব চ্যালেঞ্জের পরেও বাংলাদেশী মেয়েরা সাউথ এশিয়ান ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডিসহ বিভিন্ন খেলায় তাদের অপরাজেয় নৈপুন্য দেখিয়ে বিশ্বকে অবাক করে দিচ্ছে। এই জয়, এই প্রাণোচ্ছ্বাসকে ধরে রাখতে এবং তা আরো বিকশিত করতে নারী খেলোয়াড়দের নিয়ে একশনএইড বাংলাদেশ এবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৮ আয়োজন করেছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের ১১জন নারী খেলোয়াড়দের জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার গল্প তুলে ধরা হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ এই খেলোয়াড়দের সম্মাননা দেয় একশনএইড বাংলাদেশ। সম্মাননা পাওয়া খেলোয়াড়রা হলেন, বাংলাদেশ জাতীয় কাবাডি দলের দলনেতা- শাহনাজ পারভীন মালেকা, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের দলনেতা- রুমানা আহমেদ, বাংলাদেশ জাতীয় অনুর্ধ্ব ১৫ ফুটবল দলের দলনেতা- মারিয়া মান্দা, ভারোত্তোলনে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত, পর্বতারোহী – ওয়াসফিয়া নাজরীন, শ্যুটিং-এর উম্মে জাকিয়া সুলতানা টুম্পা, এ্যাথলেট- শিরীন আক্তার, সাঁতারু- সোনিয়া আক্তার, টেবিল টেনিস-এর সোনাম সুলতানা সোমা, বাংলাদেশ জাতীয় বাস্কেটবল দলের দলনেতা- আসিন মৃধা, গলফ-এর সামাউন আনজুম অরণী এবং ঘোড় সওয়ার- তাসমিনা আক্তার। এদের সঙ্গে দুইজন সাংবাদিক, একজন রেফারি এবং একজন সাবেক শ্যুটারকেও সম্মাননা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

সম্মাননা জানানোর পর এসব নারী খেলোয়াড়, সরকারের নীতি-নির্ধারক, মানবাধিকার কর্মী, পৃষ্ঠপোষক এবং গবেষকদের নিয়ে একটি আলোচনার আয়োজন করা হয়। যেখানে নারী খেলোয়াড়রা তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা বলেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় শ্যুটার শারমীন আক্তার রত্না বলেন, ”আামাদের জন্য কোন বেতন নেই। আমাদের খেলার কোন মূল্যায়ন নেই। পুরুষ খেলোয়াড়রা কোন খেলায় জিতলেই তাদের গাড়ি-বাড়ি দেয়া হয়। কিন্তু আমরা এত অর্জন করেও সেটির মূল্যায়ন পাই না। পুরুষরা কিছু করলেই সেটি বড় করে সংবাদ হয়। কিন্তু আমাদের-টা হয় না। সাকিবের মেয়েকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যেরকম ছবি তোলেন আমাদের সন্তানদের নিয়েও তা করা উচিত। যাতে অন্য মেয়ারা উৎসাহিত হয়।”

কাবাডি দলের দলনেতা শাহনাজ পারভীন মালেকা বলেন, ”আমাদের অনেক অর্জন আছে তবে তার মূল্যায়ন হয় না। বিনিয়োগ করা হয় না আমাদের খেলায়। প্রচার হয় না আমাদের সাফল্যের। সঠিকভাবে আমরা ভাতা পাই না।”

বাংলাদেশ বাস্কেটবল দলের দলনেতা আসিন মৃধা বলেন, ”নারীরা যে বাস্কেটবল খেলতে পারে এটাই অনেকে বিশ্বাস করতে চায় না। আমরা খেলার জন্য নিরাপদ জায়গা পাই না। আবার একজন নারী যখন এই খেলায় আসে তখন তার ভবিষ্যত নিয়ে শংকায় থাকে। কারণ জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড়দেও কোন আর্থিক নিরাপত্তা নেই।

আন্তর্জাতিক ফুটবল রেফারি জয়া চাকমা বলেন, “নারী খেলোয়াড়রা ঠিকভাবে প্রশিক্ষণও পান না। জাতীয় পর্যায়ে যখন খেলার বিষয় আাসে তখন পৃষ্ঠপোষক পাওয়া যায় না। সরকার বা বেসরকারিভাবে যে আর্থিক সহযোগিতা দরকার তা পাওয়া যায় না।”

আয়োজকরা জানান, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে এদেশের নারী এবং কিশোরীরা। তাদের এগিয়ে যাওয়ার সাহস এদেশের যুবাদের প্রবলভাবে অনুপ্রাণীত করেছে। সমাজ পরিবর্তনে তাঁদের এই বলিষ্ঠ ও অনুকরণীয় ভূমিকা নারীর এগিয়ে চলার পথকে আরো সুগম করতে সহায়তা করেছে।

অভিনেতা আফজাল হোসেন বলেন, “নারীদের অর্জনের মূল্যায়ন করা খুবই জরুরি। তখনই তারা সামনে এগিয়ে যেতে আরো উৎসাহিত হবে। খেলাধুলার এই ক্ষেত্রে লিঙ্গ-বৈষম্য করা উচিত না।”

নারী নেত্রী খুশি কবির বলেন, “বাস্তবতা হলো একজন নারী বা কিশোরী খেলোয়াড়কে নানা ধরনের বৈষম্যের সম্মুখীন হতে হয়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে লিঙ্গ-বৈষম্য, সমালোচনা এবং সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হন নারী খেলোয়াড়রা। ক্রীড়া ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ খুবই দু:খজনক। এটি নারীর ক্ষমতায়নের অন্তরায়। নারী খেলোয়াড়দের প্রতি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।”

যুবা ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় বলেন, “সরকার নারী খেলোয়াড়দের উন্নয়নে কাজ করছে। নারী খেলোয়াড়দের উন্নতি হলে আমরা আরো এগিয়ে যাবো।”

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, “নারীরা প্রথমে পরিবারই খেলাধুলায় বাধা পান। এরপর যখন তারা একটু একটু এগিয়ে আসে তখন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার হন। যখন তারা জাতীয় পর্যায়ে আসেন তখন তারা পান না পৃষ্ঠপোষক। তাদের উন্নয়নে পাওয়া যায় না বিনিয়োগকারী। ফলে নারীরা এগিয়ে যেতে পারে না।”

আলোচকরা বলেন, বস্তুত:, সরকারি কর্তৃপক্ষ, সংস্থা ও বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে যাবে এদেশের নারী ও কিশোরীরা।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০-এ খেলাধুলাকে উন্নয়নের অন্যতম নির্দেশক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যা কিনা নারী এবং কিশোরীর ক্ষমতায়নসহ একটি সমন্বিত সমাজ গঠনে সহায়ক। একশনএইড বাংলাদেশ-এর এবারের আয়োজন সেইসব নারী এবং কিশোরীদের নিয়ে যারা ক্রীড়াঙ্গনে আপন মর্যাদায় মহিমান্বিত হয়ে এদেশের প্রথাগত জেন্ডার ধারণা পরিবর্তন করতেই এই আয়োজন।


Shares