প্রচ্ছদ


সৃষ্টি চিরকল্যাণকর অর্ধেক করেছে নারী

08 March 2018, 15:48

বহ্নি চক্রবর্তী
This post has been seen 568 times.

 বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

বহ্নি চক্রবর্তীঃ এই দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা । সেই মিছিলে চলে সরকার লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন । ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হলো । ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন ।  এরপর, ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন । ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন । এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন ।

সিদ্ধান্ত হয়ঃ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে । দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা । ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল । বাংলাদেশেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে । অতঃপর ১৯৭৫ সালে খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয় । দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ । এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার ।

১৯৯৬ অতীত উদযাপন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা (Celebrating the Past, Planning for the Future)
১৯৯৭ নারী এবং শান্তি (Women and the Peace Table)
১৯৯৮ নারী এবং মানবাধিকার (Women and Human Rights)
১৯৯৯ নারী প্রতি সহিংসতামুক্ত পৃথিবী (World Free of Violence Against Women)
শান্তি স্থাপনে একতাবদ্ধ নারী (Women Uniting for Peace)
২০০১ নারী ও শান্তি : সংঘাতের সময় নারীর অবস্থান (Women and Peace: Women Managing Conflicts)
২০০২ আফগানিস্তানের নারীদের বাস্তব অবস্থা ও ভবিষ্যৎ (Afghan Women Today: Realities and Opportunities)
২০০৩ লিঙ্গ সমতা ও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (Gender Equality and the Millennium Development Goals)
২০০৪ নারী এবং এইহ আই ভি/ এইডস (Women and HIV/AIDS)
২০০৫ লিঙ্গ সমতার মাধ্যমে নিরাপদ ভবিষ্যত (Gender Equality Beyond 2005; Building a More Secure Future)
২০০৬ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী (Women in Decision-making)
২০০৭ নারী ও নারী শিশুর ওপর সহিংসতার দায়মুক্তির সমাপ্তি (Ending Impunity for Violence Against Women and Girls)
২০০৮ নারী ও কিশোরীদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ(Investing in Women and Girls)
২০০৯ নারী ও কিশোরীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে নারী-পুরুষের একতা (Women and Men United to End Violence Against Women and Girls)
২০১০ সমান অধিকার, সমান সুযোগ- সকলের অগ্রগতি (Equal Rights, Equal Opportunities: Progress for All)
২০১১ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নারীর সমান অংশগ্রহণ (Equal Access to Education, Training, and Science and Technology:  Pathway to Decent Work for Women)

২০১২ গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়ন- ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সমাপ্তি (Empower Rural Women, End Poverty and Hunger)
২০১৩ নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময় (A Promise is a Promise: Time for Action to End Violence Against Women)
২০১৪ নারীর সমান অধিকার সকলের অগ্রগতির নিশ্চয়তা (Equality for Women is Progress for All)
২০১৫ নারীর ক্ষমতায়ন ও মাবতার উন্নয়ন (Empowering Women, Empowering Humanity: Picture it!)
২০১৬ অধিকার মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমানে সমান (Planet 50-50 by 2030: Step It Up for Gender Equality

২০১৭ নারী-পুরুষ সমতায় উন্নয়নের যাত্রা, বদলে যাবে বিশ্ব কর্মে নতুন মাত্রা। (Women in the Changing World of Work: Planet 50-50 by 2030)
২০১৮ সময় এখন নারীর: উন্নয়নে তারা বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরের কর্ম-জীবনধারা (Time is Now: Rural and urban activists transforming women’s live ।

এদিনে নারীদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান, বিশেষ স্বীকৃতি, সব কিছুতেই বিশেষ আয়োজন থাকে । এমনকি টিভির আ্যড গুলিতেও বিশেষভাবে নারীর অবদান সম্পর্কে ভাল ভাল কথা বলা হয় । খুব অবাক লাগে এই বিশেষ ভাবে নারী দিবস পালনের ঘটা দেখে, এর মানে কি  ?  আমরা যারা নারী তারাও প্রবল উৎসাহ আর উদ্দিপনায় নারী দিবস পালন করি, খুব গর্বিত থাকি আজ আমাদের নারীত্বের স্বীকৃতি দিবস ।  কিন্ত হে বিশ্বের নারী- আপনারা কি কখনও ভেবেছেন ?  বিশেষ ভাবে এই দিনটি পালন করার কি বিশেষ কোন দরকার আছে ? প্রায় ১০০ বছর ধরে নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য এই দিনটি বিশেষভাবে পালন করা হচ্ছে । কিন্ত কথা হল নারীর অধিকার কে দেবে- পুরুষ ? পুরুষ কেন একজন নারীকে তার অধিকার দেবে ? নারীওতো পুরুষের মতই একজন মানুষ, তাহলে পুরুষদের কাছ থেকে কেন স্বীকৃতি বা অধিকার পেতে হবে ? কোন পুরুষ কি কখনও তার অধিকার নারীদের কাছে চেয়েছে ?

আসলে দোষটা আমাদের- মানে নারীদের । আমরা নিজেরা নিজেরদের মর্যাদা সম্পর্কে যথেষ্ট সজাগ নই !  আমারা পুরুষের উপর নির্ভর হতে পছন্দ করি, পুরুষদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেতে চাই । আমরা আমাদের নিজেদেরকে দূর্বল ভাবি ।  কিন্ত একটু চিন্তা করে দেখেন -এই যে নির্ভরশীলতা সেটা কি আমাদের মর্যদা বাড়াচ্ছে ?  নাকি আমরাই আমাদের মর্যাদা কমাচ্ছি ?  আমার কাছে বিশেষ ভাবে আমাদের জন্য একটি দিন পালনের মানে হল – আমরা নারী,  আমরা অবলা,  আমাদেরত অন্তঃপুরে থাকার কথা ,  হেঁশেলে সারাদিন ঘেমে নেয়ে কাটানোর কথা এবং আমাদের কষ্ট ও আমাদের পরিশ্রমের কোন মুল্য পাবার কথাও নয়, তবুও তোমরা যে আমাদের বাইরে আসার অনুমতি দিয়েছ, আমাদের কাজের স্বীকৃতি দিয়েছ এবং আমাদের জন্য যে একটা বিশেষ দিবস বেধে দিয়েছো ?  যে দিনে ঘটা করে তোমরা পালন করবে আমার কাজের স্বীকৃতি বা আমার অধিকার আদায়ের কর্মসুচি, তোমারা আমার কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ আমায় সম্বর্ধনা দেবে ।  ফুলেল শুভেচ্ছাবানীতে আমায় সিক্ত করবে– এজন্য আমরা তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ । আমাদের এই একদিনের স্বীকৃতি স্বরুপ আমি সারা বছর নিজেকে নারী হিসাবে গর্বিত আর আনন্দিত বোধ করব ।

ভাবতেও খুব অবাক লাগে আমরা নারীরা এখনো আমাদের নিজেদের মর্যাদা সম্পর্কে সজাগ নই ।  আমরা এখনো কারো না কারো উপর নির্ভরশীল । শৈশব থেকে শুরু করে বিয়ের আগ পর্যন্ত বাবা বা ভাইয়ের ঘাড়ে, বিয়ের পরে স্বামীর এবং শেষ বয়সে ছেলের ঘাড়ে । আমরা কখনই ভাবি না আমরাও মানুষ, একজন পুরুষের মত আমাদের ও আছে হাত পা,  জ্ঞান,  বুদ্ধি, সবই আছে ।  শুধু হয়ত শারিরিক ভাবে আমরা পুরুষের চেয়ে কিছুটা দূর্বল,  এছাড়া সবই সমান ।  আমরা কেন তাহলে আরেকজনের উপর নির্ভরশীল হব ?  কেন নিজের আত্নমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হব না ।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস
ভগিনী নিবেদিতা মায়ের সম্বন্ধে কথা বলতে বলেছেন, তাঁর দেখা “পৃথিবীর মহত্তমা নারী” হলেন শ্রীশ্রীমা । আদপেই এই উক্তিটুকুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে শ্রীশ্রীমায়ের মূল স্বরূপ । তিনি কেবল রামকৃষ্ণ ঘরণী হয়েই থেকে যাননি । রামকৃষ্ণের পরিচয়ে পরিচিতা হয়ে উঠেননি কেবলই , শুধুমাত্র গুরুপত্নী হয়েই জীবন কাটিয়ে দেননি । তিনি তাঁর সমস্ত জীবন দিয়ে আমাদের তথা তৎকালীন গোঁড়া হিন্দু সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন প্রকৃত নারীবাদী চরিত্র কেমন হওয়া উচিত ।
তিনি সকলের মা, ঠাকুরের বিধিনিষেধ কে হেলায় সরিয়ে তিনিই বলেছেন, “আমার কাছে মা বলে এসে কেউ দাড়ালে, তাকে ফেরাতে পারব না ।”  মাই যে নারীর শ্রেষ্ঠতম রূপ । তৎকালীন গোঁড়া হিন্দু সমাজের হাজারো বিধিনিষেধ কে তিনি ভেঙেছেন, আমাদের জন্যে, তাঁর কাছে আগত সন্তানদের জন্যে, হয়েছেন “গণ্ডিভাঙা মা” ।  সমাজের অস্পৃশ্য, নীপেড়িত, অবহেলিত মানুষদের কাছে টেনে নিয়েছেন, তাদের নিজের কাছে বসে খাইয়েছেন, সর্বধর্মের মানুষকে একসাথে বসিয়ে খাওয়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, কিছুক্ষেত্রে তা করেওছেন ।  এরজন্যে সমাজপতিদের রূঢ় ব্যবহার পেয়েছেন, তারা তাঁর উপর জরিমানা দায়ের করেছে, তা মিটিয়ে দিয়েছেন তবু নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন । বলেছেন, “আমি সকলের মা।”  নারীশিক্ষা তৎকালীন সময়ে ছিল এক বাতুলতা মাত্র,  সেই বিষয়েও মা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন । বলেছেন, “মেয়েদের লেখাপড়া, সেলাই-ফোড়াই এসব শেখা ভাল, বিয়ের পরে শশুরঘরে কাজে আসে।”  রাধুকে পড়াশোনা শিখিয়েছেন । যে মানুষটি নিজে কোনোদিনও স্কুলে যাননি, বই পড়েননি, তাঁর পক্ষে এই নারীশিক্ষার প্রতি আগ্রহ তথা অভয়দান এক যুগান্তকারী ঘটনা বলেই আমার মনে হয়,  তৎকালীন সমাজের প্রেক্ষাপট জানলে । কেবলমাত্র নারীশিক্ষাই নয়, নারী স্বাধীনতা, নারী অধিকার প্রত্যকেটি বিষয়েই তাঁর অগ্রনী ভূমিকা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ।  বাল্য বিধবারা তাঁর কাছে থাকত, তিনি বলতেন, মাছ খাক তাতে দোষের তো কিছু দেখি না ! ! ! আজ বাধা দিলে দুদিন বাদে অন্য বাজে দিকে মন যাবে, মনকে শান্ত রাখার প্রয়োজন, আত্মাকে কষ্ট দেওয়া উচিত নয় । যা মনে চায় খাক । শুধু কথায় নয় কাজেও তিনি করে দেখিয়েছেন এই ব্যতিক্রমী কাজগুলি । নীরবে, নিভৃতে তিনি তাঁর মহত্তমা নারীচরিত্রের পরিচয় রেখে গেছেন আমাদের কাছে । তখনকার দিনে এত প্রচারের আলো ছিল না, দিনেকালে পরিবর্তন এসেছে । নারীবাদী বহু চরিত্র এসেছে আমাদের সামনে, কিন্তু আমাদের মায়ের মতো এমন এক নারী, যিনি গ্রাম্য হয়েও চির আধুনিকা । সমাজের কলঙ্কিত নারীদেরও যিনি অবলীলাক্রমে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়েছেন, সমাজে নতুন ভাবে পরিচিতি দিয়েছেন, এমন নারীবাদী চরিত্র তৎকালীন তথা সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল । যুগাবতার থেকে শুরু করে যুগনায়ক যাঁর চরণবন্দনা করেছেন, আবালবৃদ্ধ-বণিতা যাঁকে তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল, তাদের মা বলে জানেন ।


Shares