প্রচ্ছদ


“আমি কী মাতৃভূমীতে পা রাখতে পারব না”?-সৌরভ দত্ত

09 March 2018, 03:35

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 862 times.

সৌরভ দত্ত, যুক্তরাজ্য থেকেঃ দেশ শেষবার গিয়েছিলাম ২০১৪ সালের এপ্রিলে । ২০ দিনের মাথায় ফেরত আসতে হয় প্রাণ ভয়ে । কারণ আমি বীজ্ঞানসম্মত যুক্তি দিয়ে লেখালেখি করে আসছি ২০০৯ সাল হতে ।  দেশে থাকতে পারিনি, মৌলবাদি সন্ত্রাসীদের কারনে । আমাকে হুমকি দেয় নানা ভাবে । শত প্রকিকুলতার ভেতর সহায় হয় স্টুডেন্ড ভিসা, সেই ভিসাতেই যুক্তরাজ্যতে পাড়ি জমাই ২০০৯ সালে । যুক্তরাজ্যতে এসে একটি ব্লগ পেজ ওপেন করি । পড়া-লেখার ফাঁকে ব্লগ চালাতাম, ব্লগে এমন সব অকথ্য ভাষায় কমেন্ট আসত, স্তম্ভিত হয়ে যেতাম মানুষের ভাষার প্রয়োগ দেখে । কমেন্ট-এ এসব লেখলে সামনে পেলে শকুনের মরা গরু খাওয়ার মতো খেয়ে নেবে উর্গ মৌলবাদ বিশ্বাসিরা । পড়ার চাপে সময় দিতে পারিনা বলে একটি সময় ব্লগপেজ ডিলেট করে দেই । মাঝে-মাঝে সময় পেলে কয়েটি পোর্টালে লেখা পাঠাই, সেটা এখনো পাঠাই। পোর্টালের নাম ! (নাম গুলো অজানাই থাক) । নিজ নামে আবার কখনো ছদ্মনামে । ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চ যখন শাহবাগে শপথ নিচ্ছে, তখনও শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রজন্ম চত্বরে এসে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে কণ্ঠ মিলিয়েছে । তারই ধারাবাহিকতায় আমি যুক্তরাজ্যে সংগঠিত করি একদল তরুণ যুবক ।

খুবই কম সময়ের মধ্যে আমরা রাস্তায় অবস্থান নেই বাংলাদেশে মৌলবাদ এর বিপক্ষে । রাজাকারদের ফাসীর দাবি জানাই আন্তর্জাতিক ভাবে । আমাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে স্থানীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন । চিন্তা ও চেতনায় ৭১কে লালন করি বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস বিকৃতি আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি;  আজকের সাম্প্রদায়িকীকরণ তাদেরও ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না । গণজাগরণ মঞ্চের একজন কর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, একটি গণআন্দোলনের এর চেয়ে ফলপ্রসূ কোনো প্রভাব থাকতে পারে না । গণজাগরণ মঞ্চ গণমানুষের শক্তি। গণজাগরণ মঞ্চের সবাই কর্মী।

বিবিসি প্রকাশ করেঃ (১ মে ২০১৬) বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রপন্থিদের হামলার শিকার হয়েছেন এমন মানুষের তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার, শিক্ষাবিদ, এলজিবিটি কর্মী, শিয়া, সুফি আহমাদিয়া মুসলিম, খ্রিস্টান ও হিন্দু সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগকেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। টাঙ্গাইলে নিখিল জোয়ারদার নামে একজন দর্জিকে গতকাল কুপিয়ে হত্যার পর এসব কথা লিখেছে অনলাইন বিবিসি। এতে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসরকে হত্যা করা হয়েছে। তার পরিবার বলছে, তিনি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করতেন। তাকে হত্যার ঘটনায় এটা পরিষ্কার যে, যারা এমন হত্যার ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় আছেন তার ক্রমশ বিস্তার ঘটেছে। এসব হামলার নেপথ্যে কে বা কারা তা রয়েছে অস্পষ্ট। বাংলাদেশে রয়েছে অনেক উগ্রপন্থি গ্রুপ। এসব হামলায় খুব কমই শাস্তি দেয়া হয়েছে। হামলার দায় স্বীকার করেছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আল কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলো। কিন্তু দায় স্বীকার নিয়ে আপত্তি আছে বাংলাদেশের। এর পরিবর্তে দেশটি এসব হত্যার জন্য বিরোধী দল ও স্থানীয় ইসলামি গ্রুপগুলোকে দায়ী করেছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সরকারকেই অভিযোগ মোকাবিলা করতে হবে ।

হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় বাংলাদেশে প্রথমে, ড. হুমায়ুন আজাদ স্যারকে কুপানোর পর হতে সেই আঘাতেই কিছুদিন বেঁচে থেকে মৃত্যু বরণ করতে হয়।  ১৫ ফেব্রুয়ারি, জঙ্গিদের হাতে খুন হওয়ার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর রাজীবের বাসায় যান। রাজীব হায়দার শাহবাগে জড়ো হওয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষের মতন শাহবাগের একজন সমর্থক ও কর্মী ছিলেন । শাহবাগ আন্দোলনের সময় শুধু রাজীব হায়দার নন পরবর্তীতে খুন হোন আরও অনেকে । এর মধ্যে রাজাকার গোলাম আযমের সাক্ষী গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ভাই মিরাজ আহমেদ হত্যা অন্যতম । প্রাথমিকভাবে রাজীব হায়দার খুনের ঘটনায় জামাত-শিবিরের সম্পৃক্ততা মনে করা হলেও পরবর্তীতে দেখা গেল তিনি খুন হয়েছেন তার নিজের লেখালেখির কারণে । খুনিরা আনসার বাংলা ও বিভিন্ন নামে জঙ্গি সংগঠনের সদস্য । গণজাগরণ মঞ্চের অনলাইন আ্যক্টিভিস্ট ও ব্লগার গত ৫ বছরে বলী হোনঃ ১/ আহমেদ রাজিব হায়দার (১৫/২/২০১৩) ২/ শাফিউল ইসলাম (১৫/১১/২০১৪) ৩/ অভিজিত রায় (২৬/২/২০১৫) ৪/ ওয়াশিকুর রহমান বাবু (৩০/৩/২০১৫) ৫/ অনন্ত বিজয় দাস (১২/৫/২০১৫) ৬/ নিলয় নীল (৬/৮/২০১৫) ৭/ নিজামুদ্দিন সামাদ (৬/৪/২০১৬)। আরো আছেন ।

সর্ব শেষ যখন জানতে পারি, সিলেটে অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল স্যারের ওপর প্রাণ নাশের হামলা করেছে, দেশে ফোন করতে ভয় হচ্ছিলো এই হয়ত শুনব স্যারকে হারালাম ।  রাতের বেলায় টিভিতে বাংলা সংবাদে দেখি স্যারকে উন্নত চিকিৎসার জন্যে নেয়া হয়েছে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। শঙ্কা তখনও কাটেনি স্যারের অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে মনে করে পায়চারি করে রাত কেটেছে । স্থানিয় সময় (৪মার্চ) সকাল ৮.৩০ টার সংবাদে দেখতে পেলাম প্রধানমন্ত্রী স্যারকে দেখতে হাসপাতালে গেছেন, ডাক্তার বললেন স্যার সম্পূর্ণ  শঙ্কামুক্ত ।

এমন বড় মাপের ব্যক্তিদের পুলিশ প্রহরায় হামলা হলে দেশে, মাতৃভূমী, জন্মমাটি আমরা সাধারণ লেখক কি কখনো দেখতে পারবনা ? আর কতটা রক্তের বন্যা হলে শুদ্ধভাবে মুক্ত হবে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদ থেকে ? আমার মতো দেশের ছেলে মাতৃভূমীতে পা রাখতে পারব না ? আমি কী দেখবনা শান্তিময় জননিরাপত্তার সোনার বাংলা ?


Shares