প্রচ্ছদ


প্রসঙ্গঃ কুসংস্কার

25 March 2018, 03:33

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 699 times.

প্রসঙ্গঃ কুসংস্কার ( বিশেষতঃ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য)

তপন বিশ্বাসঃ কুসংস্কার একটি সামাজিক ব্যাধি। আদিকাল থেকেই বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন রূপে এই ব্যাধি জেঁকে বসে আছে। এগুলোকে ‘ধর্ম’ বা ‘শাস্ত্র’র আবরণ পরিয়ে যখন আরো গ্রহণযোগ্য করার ব্যবস্থা করা হয়, তখন ফল হয় আরো মারাত্মক। ধর্ম বা শাস্ত্রের নামে সমাজের ওপর এমন সব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়, যেগুলো অযৌক্তিক তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে অমানবিক। এই বিধি-নিষেধ গুলো কিন্তু নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান ভাবে প্রযোজ্য হয়নি। সমাজ যেহেতু পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে, তাই তথাকথিত সমাজপতিরা বিশেষ চাতুর্যের সঙ্গে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে অনেক অর্থহীন,নিষ্ঠুর, অমানবিক ‘বিধান’-এর বোঝা নারীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।
হিন্দু সমাজে এমনি অনেক কুপ্রথা বিদ্যমান ছিল যা কালের বিবর্তনে নির্মূল হয়েছে। নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি রক্ষা করার জন্য মানুষের অশিক্ষা-কুশিক্ষাকে সম্বল করে তথাকথিত সমাজপতিরা সতীদাহ নামক একটি জঘন্য এবং চরমতম নিষ্ঠুর প্রথাকে কার্যকর করতে গিয়ে সদ্য স্বামীহারা অনেক মেয়েকে পুড়িয়ে ‘খুন’ করেছে। বিদ্যাসাগর মহাশয় অনেক চেষ্টা করে বিধবা-বিবাহ প্রচলন করলেও আজো তা’ সামাজিক স্বীকৃতি পায়নি। সমাজে অারো অনেক কুপ্রথা বা কুসংস্কার আছে যেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই ক্ষুদ্র পরিসরে সম্ভব নয়। আমি একটি বিশেষ প্রথার ব্যাপারে সমাজের আলোকিত এবং উদার অংশের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
হিন্দু সমাজে, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ সমাজে বিধবাদের ‘নিরামিষ’ খাওয়া বাধ্যতামূলক। এখানে ‘আমিষ’ বলতে মাছ, মাংস, ডিম, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসূন ইত্যাদিকে বোঝানো হয়েছে। যেহেতু বিধবাদের বিয়ে করা নিষেধ, তাই খাবারগুলো উত্তেজক – এই খোঁড়া যুক্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ। না, পুরুষের জন্য এ ধরণের কোন বিধান রাখা হয়নি। স্ত্রী মারা গেলে পুনরায় বিয়ে করা বা মাছ-মাংস আগের চেয়ে বেশি খাওয়ার ক্ষেত্রেও কোন অসুবিধা নেই। মেয়েরা আর কী করবে,সমাজের চোখরাঙানির ভয়ে শিশুকাল থেকে অভ্যস্ত খাদ্যাভ্যাস অনিচ্ছায় পরিবর্তন করে আধপেটা খেয়ে অপুষ্টিতে ভুগে ধুঁকে ধুঁকে শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করবে।
দিন পাল্টেছে। শিক্ষার প্রসার এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ফলে কোন কোন সাহসী স্বামীহারা মেয়ে সমাজের চোখ এড়িয়ে বা পরোয়া না করে এখন আমিষ খাচ্ছেন। শহরে যেহেতু সামাজিক বন্ধন তত দৃঢ় নয়, কেউ কারো খবর রাখে না, তাই সেখানে এই হারটা কিছু বেশি। গ্রামাঞ্চলে অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয় নি। খাঁচার পাখি যেমন উড়তে ভুলে যায়, সামাজিক বিধিনিষেধের বাঁধন আগের চেয়ে শিথিল হলেও গ্রামের মেয়েরা ওদের সাহসটাই হারিয়ে ফেলেছে। পুরুষপ্রধান পরিবারের ভূমিকাও মেয়েদের খুব একটা পক্ষে নয়। কথায় বলে, মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু। কোন স্বামীহারা মেয়ে লুকিয়ে আমিষ খেলে তা’ অন্য মেয়েদের মুখরোচক সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এই কুপ্রথার অবসান হওয়া জরুরি। নারী-পুরুষের সম অধিকার নিয়ে আমরা যতই বাগাড়ম্বর করি না কেন, কোন কোন ব্যাপারে আমরা নির্লিপ্ত থাকি, চোখ বুঁজে থাকি। এ অবস্থা মোটেই কাম্য নয়। আশা করি, সমাজের প্রকৃত শিক্ষিত, উদার দৃৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন আলোকিত অংশ এ ধরণের নিষ্ঠুর, অমানবিক ব্যবস্থার অবসানের ব্যাপারে সোচ্চার হবেন।

তপন বিশ্বাস এর ফেসবুক থেকে নেয়া।


Shares