প্রচ্ছদ


আত্মউন্নয়ন ও সমাজ উন্নয়নে প্রয়োজন স্বদেশপ্রেম

29 March 2018, 14:22

পিযুষ চক্রবর্তী
পিযুষ চক্রবর্তী
This post has been seen 419 times.

পিযুষ চক্রবর্তীঃ হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত বাঙালির ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি। ভাষা-ভাষীর দিক দিয়ে বাংলার জনসংখ্যা আয়তনের তুলনায় অধিক। বাংলা ভাষার মোট জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ ৫৬ হাজার বর্গ মাইল বাংলা নামক ভূখন্ডে বসবাস ব্যতিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষা প্রচলিত ও বাঙালি জনসংখ্যা বসবাসরত। বৃটিশ শাসনাধীনে ভারতীয় উপমহাদেশ প্রায় ২০০ বছর শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত হয়েছিল। এসময় বাংলার জনগোষ্ঠী ও শোষন বঞ্চনার স্বীকার হয়েছিল। বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে বিভিন্ন দাবী-দাওয়া আদায়ে বাঙালিরা নিজেদের অধিকার ও স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। ধর্মের ভিত্তিতে চক্রান্ত করে পাকিস্তানী বাহিনী পূর্ব বঙ্গকে সাথে নিয়ে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা দেয়। পূর্ব বঙ্গের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা শিক্ষা সংস্কৃতি ও কৃষ্টির কোনো মিল ছিল না। তথাপি তারা পূর্ব বঙ্গকে সাথে নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছিল। পূর্ব বঙ্গের লোকজন কিছু বুঝে উঠার আগেই পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব বঙ্গের লোকদের উপর শোষন, নির্যাতন, বঞ্চনা ও চাপ প্রয়োগ করে। বিশেষ করে পূর্ব বঙ্গের মানুষের ভাষার উপর তারা চাপ দেয় যে বাংলা বলা যাবে না। পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু তাই উর্দুতে সবাইকে কথা বলতে হবে। এতে পূর্ব বঙ্গের মানুষের চরম অশান্তি ও ভোগান্তি বেড়ে যায়। সঙ্গত কারনেই ভাষা রক্ষার দাবী উঠে। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবীতে মহান ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার প্রমুখ। ভাষার অধিকারের পথ ধরেই গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক অধিকারের দাবি উচ্চকিত হয়েছিল। শুরু হয়েছিল স্বায়ত্ত্বশাসন ও স্বাধিকারের সংগ্রাম। এর পর সত্তরের নির্বাচন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সর্বভোম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বাঙালির স্বকীয়তা ধরে রাখতে ও পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তি আনয়নে বাঙালিরা খুব কম সময়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং আপন সত্ত্বা ও বাংলা নামক ভূ-খন্ড রক্ষায় সচেষ্ট হন। ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায় দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামে ৩০ লক্ষ লোক শহীদ হয়। ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানী সহ হাজার হাজার ঘর-বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনী। প্রায় ১ কোটি লোককে আশ্রয় নিতে হয়েছিল ভারতে। বাংলার বুকে দেখা দিয়েছিল দুর্ভিক্ষ ও হাহাকার। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাতে গণহত্যা এবং ২৬ শে মার্চে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে হয়েছিল সমরাস্ত্র পাক বাহিনীর সাথে। ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও এদেশীয় মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডে অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে পূর্ববঙ্গ স্বাধীন হয় এবং লাল সবুজের পতাকা উত্তোলন সহ বিশ্ব দরবারে স্থান করে নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। বিজয় ও স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের- এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ ডাকে সাড়া দিয়ে লাখো জনতা জীবন বাজি রেখে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ ভোগ ও যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা আজ ও পূর্ণ হয়ে ওঠেনি। চারিদিকে অভাব, দুর্নীতি, ফুটপাতে মানুষের ভাসমান বসতি, সু-শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, দুর্বল সমাজ ব্যবস্থা, মতানৈক্য ও প্রায় ভঙ্গুর যৌথ পরিবার ব্যবস্থা। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসার অব্যবস্থাপনা, দেশে কর্মক্ষেত্র অপ্রতুল যার জন্যে শিক্ষিত লোকের বেকারত্ব বাড়ছে, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা জনিত অশান্তি ও জনমনে শংশয় সহ অপসংস্কৃতির দৌরাত্ব বাড়ছে, স্বাধীনতা বিরোধীরা কৌশলী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সহ নানাবিধ কারণে স্বাধীনতার সুফল ও কাঙ্খিত প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তিতে ব্যবধান অনেক। তবে এ কথা বলতেই হয় যে, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মাত্যাগের বিনিময়ে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ় পদক্ষেপ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে আজকে আমরা বাঙালিরা বিশ্বের বুকে স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আমরা আবদ্ধ নই। যদি ও স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ আমরা আজ ও গ্রহণ করতে পারিনি, কাঙিক্ষত অর্থনৈতিক মুক্তি আমাদের আজও হয়নি। তবু ও আজ আমরা বলতে পারি আমাদের নিজস্ব সত্তা আছে। আছে বর্ণ, ভাষা, শিক্ষা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, বাঙালি সংষ্কৃতিসহ নিজস্ব মানচিত্র ও লাল সবুজের পতাকা। স্ব-গৌরবান্বিত স্বাধীন বাংলাদেশ, আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলা ভাষা-ভাষী ভাই বোনেরা আপন জন্মভূমি উন্নত করে গড়ে তোল। ঘরে ঘরে দেশ প্রেম ও মানবপ্রীতি জাহির কর। উন্নয়নে ঐক্য গড়। মাতা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে জাগ্রত কর। আত্ম উন্নয়ন ও সমাজ উন্নয়নে স্বদেশ প্রেম চর্চা কর। নিজ হাতে কর্ম কর। মেধা দ্বারা নীতিযুক্ত কর্ম কর। ভেজাল মুক্ত খাদ্য দ্রব্য আর ফসল উৎপাদন কর। দেশটাকে খাদ্যের স্বয়সম্পূর্ণ করে সততার সহিত ব্যবসা বাণিজ্য কর ও দেশীয় উৎপাদন দ্বারা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোল। পাহাড়, জমি, বন-বনানী ও ফসলী জমি ব্যতিরেখে আবাস গড়। সু-চিকিৎসা সেবা দানে আর সু-শিক্ষায় জাতিকে উন্নত কর। সৎগুণে নিজহিত ও পরোপকারে আত্মনিয়োগ কর। স্বদেশ প্রেম লালন ও পালন করে সম্প্রীতি আর শান্তিতে জাতি- ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে আত্ম মনে স্বদেশ প্রেম জাগিয়ে তোল। সুস্থ্য দেহে সুস্থ্য মন আর সু-প্রজনন পালন কর। মানব প্রেম চর্চা করে স্বদেশ প্রেম জাগ্রত কর। দুর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোল। সকলের মধ্যে মানব প্রেম ও দেশ প্রেম জাগ্রত হোক এই প্রত্যাশা।


Shares