প্রচ্ছদ


ডিআইজি মিজান অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বদলে অপরাধ করেছেন

05 May 2018, 02:12

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 399 times.

ডিআইজি মিজান, একটি আলোচিত নাম। তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ পুরনো। সম্প্রতি আবার এক নারী সাংবাদিককে হত্যা ও অশ্লীল ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ ওঠে। একটি অডিও রেকর্ডও প্রকাশিত হয়েছে সেই ঘটনার। কথোপকথন শুনলে মনে হবে— তিনি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা নন। কারণ পুলিশ যেখানে মানুষকে সুরক্ষা দেবে, অভয় দেবে, সেখানে তিনি একজন নারীকে ‘কথা না শুনলে ৬৪ টুকরা’ করতে চেয়েছেন।

ঘটনাটি অভিযোগ আকারে থাকলেও এবার তিনি প্রকাশ্যে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। ওই কথোপকথনের জন্য পুলিশের এই উপ-মহাপরিদর্শক দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

এমন হুমকি দেওয়াটা ফৌজদারি অপরাধ। যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের কাঁধে, সেই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তা সে অপরাধ করেছেন।

এর আগেও তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক নারীকে জোরপূর্বক বিয়ে করেন এবং তা যেন জানাজানি না হয়, সেজন্য ওই নারীকে নির্যাতন করেন বলেও অভিযোগ ওঠে। পুলিশের তদন্ত কমিটি তার প্রমাণও পেয়েছে।

ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, তদন্তসাপেক্ষে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ২৭ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যে দুই মাস কেটে গেছে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগেও শাস্তি যা ছিল, এখনও তাই আছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার পদ থেকে প্রত্যাহার করে সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে তাকে।

দেশে প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে চলেছে। পারিবারিক মূল্যবোধ, বৈষম্যমূলক আচরণ, মাদকের অবাধ বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে সমাজে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নারী নির্যাতন বন্ধে কাজ করছে বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন, এমনকি সরকারও নানা ধরনের প্রচার চালাচ্ছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, সংসদের স্পিকার নারী। নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে, কিন্তু দিন শেষে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীর সংখ্যাও কম নয়। শহর থেকে গ্রামে কোথায় নেই নারী নির্যাতনের চিহ্ন, প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই এমন খবর দেখা যায়। নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর থানায় গেলে প্রভাবশালী বা স্থানীয়দের চাপে মামলা না নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে অহরহ। গ্রাম্য বা পারিবারিক সালিশির মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে কোথাও কোথাও। তবে প্রায় সব নির্যাতনের খবরকে ছাপিয়ে গেছে, ডিআইজি মিজানের কাণ্ড।

ব্যাংকে কর্মরত এক নারী অভিযোগ করেন, তাকে উঠিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছেন ডিআইজি মিজান। চার মাস বদ্ধ ঘরে সংসার করেছেন। সম্পর্কের অবনতি হলে উল্টো জেলেও যেতে হয়েছে ওই নারীকে। এই ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর রেশ কাটতে-না-কাটতেই এক নারী সাংবাদিককে হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে। ওই নারীর সঙ্গে ডিআইজি মিজানের কথোপকথন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে আবারও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এসব নিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা কথা না বললেও, ৩ মে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।

ফোনে নারী সাংবাদিককে হুমকির ব্যাপারে ডিআইজি মিজানুর রহমান বলেন, ‘একজন ভদ্র মহিলার সাথে কনভারসেশন হয়েছে। তার জন্য আই অ্যাম স্যরি। আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।’

নারী কেলেঙ্কারির বিষয়ে পুলিশের এই ডিআইজি বলেন, ‘এ বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তদন্তাধীন রয়েছে। এটা উনারাই ভালো বলতে পারবেন, উনারা বিষয়টি তদন্ত করছেন, কতটুকু প্রমাণিত হয়েছে, কতটুকু হয়নি।’

দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে পুলিশের এই কর্মকর্তা নিজের ‘অপরাধ’ স্বীকার করে নিলেন। তিনি পুলিশ কর্তা না হয়ে একজন সাধারণ মানুষ হলে কী হতো? আমরা গণমাধ্যমে প্রায়ই খবর পাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃত করায়, কোনো বিকৃত তথ্য উপস্থাপন করায় মামলা ও গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনকি ফেসবুকে কটূক্তিমূলক লেখা বা হুমকিযোগ্য লেখার কারণেও মামলা-গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে। আর একজন নারীকে টুকরো টুকরো করা ও নুড ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির পর সরি বললেই কি শেষ হয়ে গেল?

বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছিল বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানমের সঙ্গে। তিনি বলেন যে, ডিআইজি মিজান আইনের লোক হয়ে দ্বিগুণ অপরাধ করেছেন। সরি বললেই কিছু হয় না।

নগ্ন ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি অবশ্যই যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে বলে জানান আয়শা খানম। তিনি বলেন, একজন সাধারণ নাগরিক এ ধরনের অপরাধ করলে সংশ্লিষ্ট নারীকে সুরক্ষা দেওয়া পুলিশের কাজ। আর সেখানে পুলিশের কর্তা হয়ে এমন কাজ করে ‘ডাবল (দ্বিগুণ) অপরাধ’ করেছেন। এসব দেখে সাধারণ মানুষদের মধ্যে নারী নির্যাতনের প্রবণতা বাড়বে। এর শাস্তি দ্বিগুণ হওয়া উচিত।

হুমকির পর ওই নারী সাংবাদিক বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে নেয়নি থানা কর্তৃপক্ষ। জিডি বা মামলা কোনোকিছুই হয়নি এই ঘটনায়। তবে থানা যদি মামলা না নেয় তাহলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম।

তিনি বলেন, কাউকে হত্যার হুমকি দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। ফৌজদারি দণ্ডবিধি ৫০৬ ধারায় পড়বে। এ ছাড়াও ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে যদি কারও ছবি প্রকাশ করা হয়, যেটায় কারও সম্মানহানি হয়, তাহলে আইসিটি আইনের আওতায় পড়বে। আর যৌন হয়রানির শিকার হলে নারী ও শিশু আইনের আওতায় মামলার সুযোগ রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নির্যাতনের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিবেদন মন্ত্রীর কাছে পৌঁছেছে কি না, জানার সুযোগ হয়নি। তবে দ্বিতীয় ঘটনায় অর্থাৎ নারী সাংবাদিককে হত্যা ও অশ্লীল ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির বিষয়ে তদন্ত কমিটি হয়নি। শাস্তি তো দূর!

আমরা চাই না, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ এমন কাজে জড়াক। এটা সাধারণ কারও ক্ষেত্রেও মেনে নেওয়ার মতো নয়। আমরা চাই, নারীরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাক। সমাজে যত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হচ্ছে, সবগুলোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। না হলে অন্যরা যেমন নারী নির্যাতনে উদ্বুদ্ধ হবে, তেমনই নির্যাতনের শিকার নারীরাও বিচার চাইবেন না। হয়রানি করা হলেও তিনি চুপচাপ গিলে যাবেন তা! গ্রামে নয়, এই শহরেই নীরবে নিভৃতে নির্যাতনের শিকার হয়ে যাবেন নারীরা। বিচার চেয়ে যদি উল্টো হত্যার হুমকি পাওয়া যায় এবং তা প্রকাশ হওয়ার পরেও কোনো বিচার না হয়, তাহলে আর বিচার চেয়ে কী লাভ?

আমরা চাই, এমনটা না হোক। প্রতিটি নির্যাতনের বিচার হোক। প্রতিটি নারী উচ্চকণ্ঠ হোক, উচ্চকণ্ঠ হওয়ার পর যেন থেমে না যান কেউ। নারী নির্যাতনমুক্ত হোক বাংলাদেশ। কিন্তু এই ঘটনায় কি কোনো শাস্তি আদৌ হবে ?

সৌজন্যে: প্রিয়



Shares