প্রচ্ছদ


প্রমোদ চন্দ্র দেব ও মৌলভীবাজারের দেব পরিবার

08 May 2018, 15:31

সৌমিত্র দেব
This post has been seen 601 times.

প্রমোদ চন্দ্র দেব ছিলেন একজন মানবতাবাদী সমাজসেবী, দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ, নিষ্ঠাবান পেশাজীবী এবং হতভাগ্য এক পিতা । ১৯৬৩ সালে মাত্র ৬৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যু বরণ কালে স্ত্রীর সঙ্গে পাঁচ পুত্র ও পাঁচ কন্যা সন্তান রেখে যান । পুত্র কন্যাদের প্রায় সকলেই পরবর্তীকালে শিক্ষিত ,কেউ কেউ উচ্চ শিক্ষিত হন । ছেলেরা যার যার পেশায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন । কেউ লেখক হয়ে গ্রন্থ রচনা করেন,কেউ মামলার আরজি লিখে সুখ্যাতি অর্জন করেন, কেউ অফিসে ফাইলের পরে ফাইল লিখে সুনাম লাভ করেন কিন্তু কেউ প্রয়াত পিতা সম্পর্কে কোথাও একটি লাইন লিখেছেন সেই প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যাবে না । মেয়েরাও যাদের সুযোগ ছিল প্রয়াত পিতার স্মরণে কোথাও এক মিনিট স্মৃতিচারণ করেছেন বলে শুনি নি । অথচ প্রমোদ চন্দ্র দেবের জন্য চোখের জল ফেলেছেন সমাজের অসহায় মানুষ । তিনি অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন । সমাজ পরিবর্তনে এবং এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এগিয়ে নেয়ায় তার কি অবদান ছিল সেটা নিয়ে অন্য কেউ কেন কাজ করল না,তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে ।কিন্তু তার অত্মজরাই যেখানে তাকে মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত সেখানে অন্য মানুষকে দোষ দিয়ে কি লাভ । প্রমোদ দেব কোন জাতীয় নেতা ছিলেন না । কিন্তু তার গুণাবলী ছিল জাতীয় পর্যায়ের এবং অনুকরণীয় ।তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে এখনো উদ্যোগ নেয়া যায় ।

প্রমোদ চন্দ্র দেব ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ ১৩০৭ বঙ্গাব্দ সালে জন্ম গ্রহণ করেন মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থানার কাদিপুর ইউনিয়নে উচাইল গ্রামে বাবুর বাড়িতে । এখনো কুলাউড়ার মানুষ বাবুর বাড়ি বলতে ওই বাড়িকেই বুঝে । বাবুদের মিরাশদারি ছিল। বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে তিনি মিরাশদারি চালিয়েই জীবন কাটাতে পারতেন ।কিন্তু তা না করে তিনি পড়াশোনায় মনোযোগী হন । তার বাবা কমলা চরণ দেব মিরাশদার হিসেবে ছিলেন নামকরা ।তার ভয়ে বাঘে ছাগে এক ঘাটে পানি খেতো বলে প্রবাদ আছে । প্রজাদের মঙ্গল কামনায় গভীর রাতে তিনি লাঠি নিয়ে একাই ঘুরে বেড়াতেন । কমলা দেবের বাবার নাম ছিল রাজকৃষ্ণ দেওয়াঞ্জী ।তার বাবা ছিলেন রামকৃষ্ণ দেওয়াঞ্জী ।তাদের পূর্বপুরুষ হবিগঞ্জ থেকে এসেছিলেন বলে জানা যায় । এখনো হবিগঞ্জে উচাইল নামে একটি এলাকা তাদের স্মৃতি বহন করে আছে  ।তাদের কুল দেবতার নাম দামোদর ।

প্রমোদ চন্দ্র দেব ছাত্র জীবনে খুব মেধাবী ছিলেন । তখন ইংরেজ আমল । ইংরেজী শিক্ষিত হয়েও তিনি ব্রিটিশের দাস হতে চাইলেন না । স্বাধীন পেশা খুঁজলেন । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এল এল বি পাশ করলেন । তিনি চাইলে কলকাতায়ই এই পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারতেন । কিন্তু সেবার মানসিকতা নিয়ে ছুটে এলেন সিলেটে । উজ্জ্বল গৌরবর্ণের অধিকারী দীর্ঘদেহী প্রমোদ চন্দ্র দেবকে দেখতে  ইউরোপীয়নদের মতো লাগতো । ব্রিটিশের মতোই তিনি অনর্গল ইংরেজী বলতে পারতেন । সুরমা উপত্যকা কংগ্রেসের বড় নেতা তখন মৌরাপুরের জমিদার জয় নারায়ণ দেব চৌধুরী । তার নামে সিলেট শহরে এখনো জয় নগর নামে একটি এলাকা আছে । তিনি প্রমোদ দেবের শিক্ষা দীক্ষা , আচার আচরণে মুগ্ধ হয়ে তার ভ্রাতুষ্পুত্রী সুবর্ণপ্রভা দেবের সঙ্গে তার বিয়ে দেন । বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে প্রমোদ চন্দ্র দেবকে সবাই ঠাকুর সম্বোধন করতেন ।সুবর্ণপ্রভা হলেন সকলের ঠাকুরানী । ঠাকুরের মতোই পবিত্র জীবন যাপন করতেন তিনি ।

মৌলভীবাজারের নাম তখন দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমা । সেখানে জজ আদালত প্রতিষ্টা হলে প্রমোদ দেব সেখানেই প্র্যাকটিস শুরু করেন । আইন পেশার পাশাপাশি প্রমোদ দেব শুরু থেকেই কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে তার ছিল সক্রিয় ভুমিকা ।  রাজনীতি তার কাছে সমাজ সেবা । ক্ষমতার মোহ তার ছিলনা । কখনই তিনি সংসদ সদস্য পদের জন্য লালায়িত হন নি। যে কয় জন নেতার হাতে আধুনিক মৌলভীবাজার শহর গড়ে ওঠে প্রমোদ দেব ছিলেন তাদের একজন। কিন্তু কখনো সেখানেও পদ দখলের দৌড়ে ছিলেন না ।একই ভাবে আইন পেশা তার কাছে ছিল অসহায় মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো । টাকা বানানো তার লক্ষ ছিল না । এই শহরের মোক্তার থেকে শুরু করে মুহুরি পর্যন্ত অনেকেই এই আইন পেশায় থেকে বাড়ি গাড়ি করেছে । কিন্তু তিনি আসাম প্যাটার্নের চুন সুড়কির বাড়িতেই ভালো বোধ করতেন । মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক সৈয়দ শামসুল ইসলাম বলতেন,কত গঙ্গারাম তেলিকে রাজা হইতে দেখলাম । সেখানে প্রমোদ দেবের কথা কে স্মরণ করবে । প্রমোদ দেব  সাধারণ জীবন যাপন করতেন । মহৎ চিন্তা করতেন ।তিনি নিজের কাপড় নিজেই ধুতেন । সেটা হত ঝকঝকে । নিজের জুতা নিজেই পালিশ করতেন । সেটা হত চকচকে । তাঁর জীবনের আদর্শ মেনে চলা খুব কঠিন । তার সন্তানেরা হয় তো একারণেই তাকে  স্মরণীয় মনে করেন নি ।

প্রমোদ চন্দ্র দেব সাম্প্রদায়িক ছিলেন না । তবে তার ঘনিষ্টদের মধ্যে প্রায় সকলেই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের । যেমন ইরেশ লাল সোম, বনমালী ঘোষ , সুনীল কবিরাজ । কারণ মৌলভীবাজার তখন খুব ছোট শহর । হিন্দু প্রধান । মুসলমানদের মধ্যে ছিলেন সাব রেজিস্টার  খান বাহাদুর সৈয়দ সিকন্দর আলী ,আলাউদ্দিন চৌধুরী , দেওয়ান আব্দুল বাসিত এদের সঙ্গে তার প্রীতির সম্পর্ক ছিল । পাকিস্তান আমলে ইনাম উল্লাহর  মতো মুসলিম লীগ নেতারাও তাকে শ্রদ্ধার চোখে  দেখতেন । দেশ ভাগের পরেও তাই তিনি নিজের দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারেন নি । তার সম্পর্কে প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী বলেন ,প্রমোদ দেব আমাদের চেয়ে বয়সে কিছু বড় ছিলেন । তার কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। রোকেয়া পদক প্রাপ্ত কংগ্রেস নেত্রী সুহাসিনী দাস বলেন ,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলা কালে আমরা কংগ্রেস থেকে যুদ্ধ বিষয়ক সাব কমিটি গঠন করি । দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমা সাব কমিটির আহবায়ক হতে আর কেউ সাহসী হন নি। এগিয়ে এসেছেন এডভোকেট প্রমোদ চন্দ্র দেব ।

মহা প্রয়াণ: ২৮শে অাগস্ট,১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দ। অনুযায়ী ১১ই ভাদ্র,, তালনবমী, ১৩৭০ বঙ্গাব্দ প্রমোদ চন্দ্র দেব মৃত্যু বরণ করেন । মৃত্যু কালে তিনি কোটি কোটি টাকা রেখে যেতে পারেন নি । কিন্তু যে সুনাম তিনি রেখে গেছেন তার সৌরভে মৌলভীবাজারের দেব পরিবার আজো মোহিত । তার বংশধরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম  তা ভোগ করছেন । তারা পৃথিবীর দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়লেও প্রমোদ দেবের আশীর্বাদ নিশ্চয়ই তাদের সঙ্গী হয়ে আছে ।

চলবে…


Shares