প্রচ্ছদ


পৃথিবীর বিস্ময়ের বিস্ময় কৈলাশ পর্বত

10 May 2018, 13:40

সুমন দে
This post has been seen 1025 times.

হিন্দুধর্মের সনাতন বিশ্বাস। জেনে নিই এই পবিত্র ভূখণ্ড নিয়ে কিছু কথা। শুধু হিন্দু ধর্মই নয় । কৈলাস এবং মানস সরোবর পুণ্যভূমি বলে মনে করা হয় বৌদ্ধ‚ জৈন এবং বন ধর্মবিশ্বাসেও । ভৌগোলিক ভাবে কৈলাস পাহাড় আছে তিব্বত মালভূমিতে‚ চিন-তিব্বত ভূখণ্ডে । ছটি পর্বত শ্রেণী পদ্ম ফুলের পাপড়ির মতো ঘিরে আছে কৈলাস পাহাড়কে। ২২ হাজার ফিট উচ্চতার কালো পাথরের এই পাহাড়কে প্রাচীন কাল থেকেই পৃথিবীর স্তম্ভ বলে মনে করা হয় । যা নাকি ধরে রেখেছে পৃথিবীর ভর । কৈলাস মানেই মহাদেবের আবাস । আর তার সংলগ্ন মানস সরোবর । এই দুই স্থান শুধু মাত্র হিন্দুদের কাছেই নয়, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও সমান গুরুত্বপূর্ণ । তিব্বতের প্রাচীন ‘বন’ ধর্মের কাছেও কৈলাস পর্বত খুবই পবিত্র । আর এই কৈলাসকে ঘিরে রয়েছে নানা ‘মিথ’।

প্রাচীন বিশ্বাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে আধুনিক সন্ধানেও ।| রুশ ভূবিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন‚ কৈলাস শুধু পাহাড় নয়  ।  বরং এটির অবস্থান একটি অক্ষ বা অ্যাক্সিসের মতো । অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে মনে করেন ভিন গ্রহের মানুষ এসে বানিয়ে গেছে কৈলাস পাহাড় । এবং এটি একটি পিরামিড ! সবথেকে আশ্চর্যজনক হল‚ কৈলাস পাহাড় এখনও কেউ জয় করতে পারেননি । বিশ্বের নানা দেশ থেকে এসে চেষ্টা করেছেন পর্বতারোহীরা । কিন্তু তাঁদের কারও প্রয়াস সফল হয়নি । কৈলাস থেকে গেছে আজও অধরা ।  অথচ এই পাহাড় কিন্তু দুর্গম নয় । এর থেকে অনেক বেশি দুর্গম শৃঙ্গ জয় করেছেন পর্বতারোহীরা ।  কিন্তু কোনও এক রহস্যময় কারণে তাঁদের কাছে অজেয় কৈলাস । কথিত রয়েছে, জৈন ধর্মে কৈলাসের নাম ‘অষ্টপদ’। যেখানে তাঁদের প্রথম তীর্থঙ্কর, রিশপ মোক্ষ লাভ করেন। তিব্বতের বৌদ্ধরা মনে করেন যে, তাঁদের তান্ত্রিক দেব-দেবী দেমচং ও দোরজে ফাগমো থাকেন এই কৈলাসেই। ফলে, এই পর্বতে কারোরই পা রাখা নিষিদ্ধ ।

সংস্কৃতে কেলাস (Crystal) কথা থেকে কৈলাস কথাটির উৎপত্তি  ।  কারণ বরফে ঢাকা কৈলাসকে দেখতে লাগে স্ফটিকের মতো । তিব্বতি ভাষায় এর নাম গাঙ্গো রিনপোচে । তিব্বতে বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভবাকে বলা হয় রিনপোচে ।  তাঁর থেকেই নামকরণ হয়েছে কৈলাস পর্বতের । অর্থ হল বরফের তৈরি দামী রত্ন । তিব্বতে প্রচলিত প্রাচীন কিংবদন্তি হল‚ গুরু মিলারেপাই শুধু পা রাখতে পেরেছিলেন কৈলাস-শীর্ষে । ফিরে এসে তিনি নিষেধ করেছিলেন এই পর্বত জয়ে যেতে। কারণ একমাত্র সে-ই মানুষই পারবে এর শীর্ষে যেতে‚ যার গায়ে কোনও চামড়া নেই । আধুনিক পর্বতারোহীরাও বলছে মাউন্ট কৈলাসা ইজ আটারলি আনক্লাইম্বেবল । কেন‚ সে কারণ অস্পষ্ট।

কৈলাস পাহাড়ের পায়ের কাছে আছে মানস সরোবর এবং রাক্ষসতাল ।  এ দুই হ্রদ এশিয়ার বেশ কিছু দীর্ঘতম নদীর উৎস । ১৪‚৯৫০ ফিট উচ্চতায় মানস সরোবর বিশ্বের উচ্চতম মিষ্টি জলের হ্রদ ।  প্রকৃতির আজব সৃষ্টি ! মানস-রাক্ষস দুই হ্রদ পাশাপাশি আছে ।  অথচ‚ মানসে আছে মিষ্টি জল ।  আর রাক্ষসে নোনা জল। মানস সরোবরের জল শান্ত । কিন্তু রাক্ষস তালের জল অশান্ত । রামায়ণে বলা হয়েছে শিবের পরম ভক্ত রাবণ তপস্যাবলে সৃষ্টি করেছিলেন এই হ্রদ । কৈলাস থেকে সৃষ্ট চারটি নদী— সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, শতদ্রু ও ঘাগরা, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বীদের কাছে খুবই পবিত্র । ঘাগরা নদী এক সময়ে গিয়ে মিশেছে গঙ্গা নদীর সঙ্গে । কৈলাস পর্বতকে একবার প্রদক্ষীণ করতে পারলে জীবনের সব পাপ ধুয়ে যায়। এমনই বিশ্বাস তিন ধর্মের । এই প্রদক্ষীণের রীতিকে হিন্দু ধর্মে বলা হয় পরিক্রমা। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে বলা হয় ‘খোরা’। এবং বারো বার পরিক্রমা করতে পারলে ভূত-ভবিষ্যৎ, সব জীবনের পাপস্খলন হয়ে যাবে। কৈলাস পাহাড়ের আবহাওয়ায় এমন কিছু আছে যাতে নাকি মানুষের চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ দ্রুত ফুটে ওঠে | সাধারণভাবে মানুষের নখ-চুল যে হারে বাড়ে‚ কৈলাস পাহাড়ে অন্তত ১২ ঘণ্টা কাটালে নাকি এই বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ হয়ে যায় । এরকমই হাজারো বিস্ময়ের ধারক ও বাহক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধ্যানস্থ মহাদেবের আবাস কৈলাস পর্বত।

তথ্য সুত্র: banglalive.com, bn.wikipedia.org, eibela.com



Shares