প্রচ্ছদ


দুখু মিয়া, আজ তোমার জন্মদিন

26 May 2018, 15:13

আব্দুল করিম কিম
This post has been seen 359 times.

দুখু মিয়া, আজ তোমার জন্মদিন । তোমার জন্মজয়ন্তীতে ফেইসবুকে সবার স্ট্যাটাস বর্ষণ দেখে আমারো কিছু কথা লিখতে মন চাইছে । তোমারে সঙ্গে আমার কবে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো সেটা পুরো মনে নাই কিন্তু আমার মনে আছে তোমার বিদায় দিনের কথা । ২৯শে আগস্ট ১৯৭৬ ইংরেজি ।
আমার আব্বা, বড় চার বোন সবাই কাঁদছেন । রেডিওতে সারাদিন বেজে চলছে ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ গানটি ।
আমার মনে কত প্রশ্ন ‘তুমি কিভাবে জানলে, তুমি মরে যাবে ? এখন কে তোমাকে কবর দিবে ?
আমার বয়স তখন সাড়ে তিন বছর ।

আমাদের বাসায় কোন টিভি ছিল না । ছোট চাচার বাসায় ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশনে তোমাকে শেষ দেখা দেখতে যাই । সাদা কাপড়ে জড়ানো তোমার মৃতদেহ । পিজি হাসপাতালে তোমাকে দেখতে মানুষের ঢল ।
তুমি পিজিতে থাকার সময় আমার এক ফুফুতো বোন (লনী আপা ) ইন্টার্র্নি ডাক্তার হিসাবে তোমার সেবা করেছিলেন । তোমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়ার একটি সাদাকালো ছবি প্রিন্ট করে তিনি পাঠিয়েছিলেন আব্বাকে । ছবিটি আমাদের পারিবারিক এ্যালবামে অত্যন্ত মর্যাদা নিয়ে সংরক্ষিত আছে । এছাড়া ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় সে সময় ছাপা হওয়া তোমার প্রায় ছবিই আপামনি কেটে রেখেছিলেন । সেই ছবি দিয়ে বানানো এ্যালবাম দেখে দেখে তোমার চেহারা আমার ভালোই মনে ছিল । তোমার ঝাঁকড়া চুলের যৌবনের ছবির চেয়ে ঘুরেফিরে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়া বড় বড় চোখের আসহায় মুখটি আমার মনে বেশি ভাসে ।

সেদিন টিভিতে তোমাকে নিয়েই সব অনুষ্ঠান ছিল । ঘনঘন কোরআন তেলাওয়াতের ফাঁকে ফাঁকে তোমার লেখা হামদ ও নাত শুনি । আমার বড় বোন আপামনি’র কণ্ঠে এসব হামদ-নাত আমার অনেক শোনা হয়েছে । আপামনির সঙ্গে যখন তোমার হামদ ‘আল্লাহ আমার প্রভু আমার নাহি নাহি ভয়, আমার নবী মোহাম্মদ, যাহার তারীফ জগৎময়’ প্রথম শুনি ও গাই সেদিন থেকে আমি বিশ্বাস করতাম ‘আল্লাহ আমার প্রভু’ এই জন্য আমার কোন ভয় নাই । আমি নবী মোহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে প্রথম আগ্রহবোধ করি যখন শুনি ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে- মধু-পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে’ । এই নাত শুনে নবীর জন্ম বৃত্তান্ত শোনার আগ্রহ হয় । একদিন রেডিওতে আব্দুল আলীমের কণ্ঠে ‘মনে বড় আশা ছিলো যাবো মদিনায়’ গানটি বাজতে শুনি আর দেখি আব্বার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে । শৈশবে আমার কাছে তুমি ছিলে হামদ-নাতের রচয়িতা । যদিও তোমার আরও গান শুনেছি সে সময় আপার কণ্ঠে । আপাকে গান শেখাতে আসতেন ‘ওস্তাদ ফূল মোহাম্মদ’ । আমি আপামনির শিষ্য হয়ে হারমোনিয়াম বাজানো দেখতাম । আর নানান ভাবে উপদ্রব করতাম । ‘ওস্তাদ ফূল মোহাম্মদ’- অনেক বড় মাপের শিল্পি । সিলেটে নজরুলগীতি শেখার জন্য তাঁর শিষ্য হওয়া সৌভাগ্যের বিষয় । ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদের শিষ্য’র শিষ্য হয়ে তোমার গান শিখতে বসতাম । তখনো স্কুলে ভর্তি হইনি । বই-পুস্তক পড়া হয়নি । তাই তোমার কবিতা জানতাম না । দিদিমণি Shahana Begum ঘুম পাড়াতে গিয়ে একদিন লিচুচোর শোনালো ।

বাবুদের তালপুকুরে
হাবুদের ডালকুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া
বলি থাম একটু করি দাঁড়া …

তালপুকুর, ডালকুকুর, লিচুচুরি-এই সব আমার কাছে নতুন বিষয় । চোখ বন্ধ করে লিচুগাছ দেখতাম আর ভাবতাম আমিও লিচু চুরিতে যাবো । তোমার মত ধরা খাবো না । আমাদের বাসার পিছনে ছিল খোলা প্রান্তর । সেখানে বুনোফুলে প্রজাপতির ওরাউড়ি দেখতাম । সেই প্রজাপতির পিছনে দৌড়ে দৌড়ে গান গাইতাম ‘প্রজাপতি প্রজাপতি কোথায় পেলে ভাই, এমন রঙ্গিন পাখা ?’

১৯৮০ সালে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর ক্লাসের সিলেবাসে তোমাকে পেলাম । তোমার দুখু মিয়া নাম জানলাম । তোমার নাম দুখু মিয়া কেন হল- এটাই আমার বোধগম্য ছিল না । তুমি লেটো দলে যোগ দিলে, পড়াশোনা নিয়ে যন্ত্রণা নেই । রুটির দোকানে চাকরি কর- কত মজা । তোমার নাম হবে ‘সুখু মিয়া’ । আমার তোমার মত বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে কোন গানের দলে যোগ দিতে মন চাইতো ।

১৯৮২ সালে পাড়ার মসজিদে ঈদ-ই-মীলাদুন্নবী (সাঃ) উপলক্ষ্যে আয়োজিত হামদ-নাত প্রতিযোগিতায় ‘মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে’ -তোমার নাত গেয়ে জীবনে প্রথম পুরস্কৃত হই । সেই পুরস্কারো ছিল- তোমার শিশুতোষ জীবনী । এরপরেও জীবনে আরও অনেকবার নাত গেয়ে পুরস্কৃত হয়েছি ।
তোমার হামদ-নাতের বাইরে যে গানের আরও বিশাল ভাণ্ডার আছে তা খেয়াল করি ভবানী চাচার কাছে গান শিখতে বসে । গান অবশ্য আমি শিখতে বসতাম না । বসতো দিদিমণি । আব্বার এক নাতির বন্ধু ভবানী সিনহা (বর্তমানে হাই-কোর্টের বিচারপতি ) ছিলেন সেই নজরুলগীতি শেখানোর শিক্ষক । তিনি দরদ মাখা কণ্ঠে ‘গঙ্গা-সিন্ধু-নর্মদা-কাবেরী-যমুনা ঐ, বহিয়া চলেছে আগের মত কইরে আগের মানুষ কই ?’ কিংবা ‘যবে তুলসী তলায় প্রিয় সন্ধ্যা বেলায় / তুমি করিবে প্রনাম / তব দেবতার নাম ভুলিয়া বারেক / প্রিয় নিও মোর নাম //’ গাইতেন আর আমি মুগ্ধ হয়ে তোমার সৃষ্টি উপলব্ধি করতাম ।

১৯৮৫ সালে প্রথম শুনি তোমার শ্যামা সংগীত । এতদিন তোমাকে একভাবে চিনতাম,শ্যামা সংগীত শুনে তোমাকে অন্য ভাবে চিনলাম । অনুপ জালোটার কণ্ঠে ‘সখী সে হরি কেমন বল / নাম শুনে এতো প্রেম আসে চোখে আনে এতো জল’- আমি শুনতাম আর চোখে জলের আনাগোনা বুঝতে পারতাম ।
১৯৮৭ সালে অগ্নিবীণা মুখস্ত করতে শুরু করলাম । পড়ার টেবিলে বসে পড়ার বই ভালো লাগে না । ‘বিদ্রোহী’ মুখস্ত করি । ক্লাস এইটে বা নাইনে হাফ-ইয়ার্লি পরিক্ষায় ইংলিশ ২য় পত্র পরিক্ষা । কিছু পারিনা । পরিক্ষা থেকে ওঠে যাওয়া যাচ্ছে না । কিছু না লিখে এমনি এমনি বসে থাকবো কিভাবে ? শুরু করলাম ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখা । পুরো কবিতা লিখে সময় কাটালাম । ক্লাস টিচার পাঞ্চালী পাল পান্না টিচার । টিচারের কথায় আগুনের তেজ ।
রেজাল্ট বের হল, এই বিষয়ে যথারীতি অকৃতকার্জ হলাম । টিচার সবার সামনে অপমান করলেন না ।
কিন্তু ডেকে নিয়ে বললেন, এর মানে কি ? ইংরেজি পরীক্ষায় বাংলা কবিতা লেখার অর্থ কি ?
আমি মাথা নিচু, কি বলবো ? শুধু বললাম, টিচার আমি ছাত্র খারাপ না-এটা বোঝানোর জন্য লিখেছি । আমার স্মরণ শক্তি ভালো ।
টিচার বললেন, পরীক্ষায় সব বিষয়ে যে ছাত্র পাস করে না সে খারাপই ।

তোমাকে নিয়ে এরপর দীর্ঘদিন কোন ঘাটাঘাটি করিনি । তোমার প্রচুর গান শুনেছি,গল্প-উপন্যাস পড়ে নিয়েছি ইতিমধ্যে ।
১৯৯৮-২০০৫ পর্যন্ত সময়ে তোমাকে নিয়ে আবারো ঘাঁটাঘাঁটি করি । তুমি প্রমীলা দেবীকে কি করে বিয়ে করেছিলে তা জানতে চেয়েছি সে সময়ে । তোমার মত আমারো একজন ‘প্রমীলা দেবী’কে বিয়ে করতে ইচ্ছে করছিলো । আমার অবশ তোমার নাতনী খিলখিল কাজী’কেও বিয়ে করতে ইচ্ছে করেছিলো। ১৯৯৫-৯৭ সালের মধ্যে কোন এক সময় তোমার কবরের পাশে তাকে দেখেছিলাম । তাঁকে দেখে তাঁর প্রেমে পরে যাই । আমি কলকাতার ঠিকানায় ও ঢাকায় ‘কবি ভবন’-এর ঠিকানায় প্রেমপত্র পাঠাই । আমার এখনো বিশ্বাস চিঠি তাঁর হাতে পৌঁছেনি । পৌঁছালে নির্ঘাত তুমি আমার দাদা শ্বশুর হতে ।
ভালো কথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার কবরের পাশে একাধিকবার বসে তোমার খোঁজখবর আমি নিয়েছি ।
দুখু মিয়া, তুমি মসজিদের পাশে কবর চেয়েছিলে ‘আযান’ শুনবে বলে কিন্তু তোমাকে বোনাস আরও অনেক কিছু শুনতে হচ্ছে ।

দুখু মিয়া, আমি নানান ভাবে তোমাকে অনুসরণ করতে চেয়েছি, কিন্তু মাঝপথে গিয়ে থেমে গেছি ।
তোমার মত দেশপ্রেমিক, মানবপ্রেমিক, খোদাপ্রেমিক, নবীপ্রেমিক বা নারীপ্রেমিক কিছুই হতে পারলাম না ।
তোমার মত পালিয়ে যেতে পারলাম না, ‘লিচুচোরও হলাম না । তোমার গানও শেষ পর্যন্ত শিখলাম না । কবিতাও ভুলে গেছি দুখু মিয়া ।
কেবল এখনো তোমার মত দেশপ্রেমিক হওয়ার স্বপ্ন দেখি । এখনো অসাম্প্রদায়িক হওয়ার চেষ্টা করি । তোমার মত বিদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে, সব কিছু ভেঙ্গে দিতে ইচ্ছে করে কিন্তু কিছুই পারি না দুখু মিয়া ।


Shares