প্রচ্ছদ


এবার ভারতমুখী বিএনপি

11 June 2018, 15:09

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 96 times.

অবশেষে ভারতমুখী হয়েছে বিএনপি। তুমুল ভারতবিরোধী হিসেবে পরিচিত এ দলটি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের সমর্থন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এ ইস্যুতে দলীয় মিশন নিয়ে দেশটি সফর করেছেন। বিএনপি নেতাদের কেউ প্রকাশ্যে, কেউবা গোপনে বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটির আনুক‚ল্য পেতে ধর্ণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। এর বাইরে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতীসংঘে দেনদরবার চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এসব দেশে বিএনপির পক্ষ থেকে নিয়োগকৃত লবিস্টরা দেনদরবারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওই সব দেশের ঢাকাস্থ ক‚টনীতিকরাও সহযোগিতা করছেন বিএনপি নেতাদের।
চিকিৎসার নামে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যান থাইল্যান্ডে। সস্ত্রীক তিনি সেখানে নিজের চিকিৎসা করাচ্ছেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়। কিন্তু নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি সেখানে দলের আন্তর্জাতিক লবির কর্মতৎপতরা পর্যবেক্ষণ করছেন। আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে ভারতীয় ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধী দল কংগ্রেসের দায়িত্বশীল নেতারা ছিলেন। আগামী নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ভারতীয় নেতাদের সমর্থন প্রত্যাশা করেছেন ফখরুল। দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য, একজন ভাইস চেয়ারম্যান ও আন্তর্জাতিক লবি দেখাশোনা করেন এমন নেতাও বৈঠকে ছিলেন।
ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরই যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মির্জা ফখরুলকে লন্ডনে ডেকে পাঠান। স্ত্রী রাহাত আরা বেগমকে ঢাকায় পাঠিয়ে ফখরুল নিজে যান লন্ডনে। লন্ডনের কিংস্টন এলাকায় তারেক রহমানের ভাড়া বাড়িতে শীর্ষ এ দুই নেতার রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। বৈঠকে ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে মহাসচিবের আলোচনার বিষয়গুলো ওঠে আসে। ভারতীয় নেতাদের মনোভাবও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে অবহিত করেন মহাসচিব। এর বাইরে খালেদা জিয়ার মুক্তির আইনগত প্রক্রিয়া, সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয় ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির করণীয় ও আগামী নির্বাচন এবং নির্বাচনপূর্ব আন্দোলন নিয়েও আলোচনা হয়। ভারত থেকে আমীর খসরুসহ বাকি দুই নেতাও লন্ডনে পৌঁছেছেন। আজ সোমবার বিএনপি মহাসচিবের ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।
কয়েকদিন আগে দলের বিশেষ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা এক নেতা ভারতসহ কয়েকটি দেশে দেনদরবার করে ঢাকায় ফিরেছেন। দলের সঙ্গে সম্পর্ক বিছিন্ন নেতাদেরও ডেকে নিয়ে দলীয় কাজে লাগাচ্ছেন তারেক রহমান। বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট দিচ্ছেন ভারত ও চীনকে নিজেদের পক্ষে নিতে কাজ করতে। বিএনপিপন্থি কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক এ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের কেউ অনেকদিন ধরেই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। কেউবা মাঝে মাঝে দেশের বাইরে যান। আবার কেউ ঢাকায় থেকেই দায়িত্ব চালাচ্ছেন।
সর্বশেষ অনেকটা গোপনে ভারত সফরে যান বিএনপির তিন শীর্ষ নেতা। সেখানে তারা ভারতীয় শীর্ষ মহলে যোগাযোগ করেছেন। আলাদা আলাদা বৈঠকও করেছেন সরকারি ও বিরোধী নেতাদের সঙ্গে। মোদি সরকারের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ভারতের সমর্থন চেয়েছে বিএনপির প্রতিনিধি দলটি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির এ দলে রয়েছেন।
গত ৮ জুন এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দু। পত্রিকাটির খবরে বলা হয়, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেছেন, পেছনে ফিরে তাকানোর পরিবর্তে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। ৮০ ও ৯০-এর দশকের রাজনীতি এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান চান, আমরা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হই। এখন উভয় দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয়। এ ছাড়া বিএনপি সরকারের বিগত আমলগুলোতে ভারত ও বাংলাদেশের খারাপ সম্পর্কের নীতিকে ভুল ও বোকামি বলেও মন্তব্য করেন বিএনপির এ নেতা।
হুমায়ুন কবিরের এ বক্তব্যে বিএনপি নেতাদের মধ্যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নেতাদের মতে, ভারত প্রশ্নে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের পররাষ্ট্রনীতিকে হুমায়ুন কবির প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। যদিও এ সফর তারেক রহমানের সম্মতিতে হওয়ায় বিএনপি নেতারা ক্ষুব্ধ হলেও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
যদিও বিএনপির সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী ও উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রের রাজনীতিকদের সঙ্গে কথা বলার বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে বলা হয়, যে নেতার যে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আছে, তারা নিজ উদ্যোগে বিদেশি বন্ধু রাজনীতিকদের সঙ্গে কথা বলবেন। দলীয় এমন সিদ্ধান্ত এবং তারেক রহমানের সম্মতিতেই বিএনপি নেতারা ভারতমুখী হয়েছেন। তাদের ধারণা, খালেদা জিয়ার মুক্তি রাজনৈতিকভাবে আদায় করতে হলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ী হওয়া দরকার এবং নির্বাচনে ভারতকে বিএনপির পাশে প্রয়োজন। দ্য হিন্দুতে এ বক্তব্য প্রকাশের পর বিএনপির নীরব নেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। তারা একে অপরের কাছে উৎসুক হয়ে জানতে চাইছেন, ভারতের বিষয়ে সহমর্মী হওয়ার বিনিময়ে নিজেদের বিগত দিনের পররাষ্ট্রনীতি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়া হলো কিনা।
সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত থেকে ফিরে এসে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, আমরা ভারতকে যা দিয়েছি তা ভারত সারাজীবন মনে রাখবে। আমরা কিন্তু তাদের শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছি, আমরা কোনো প্রতিদান চাই না। তখনই প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে কড়া সমালোচনা করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রতিদান চেয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাই যদি হয়ে থাকে তবে জনগণের জানার অধিকার আছে, ভারতের কাছে কী প্রতিদান চাওয়া হয়েছে, তাদের কাছ থেকে কী আশ^াস পাওয়া গেছে। বছরখানেক আগেও প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তখন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার অনেক চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির একগুঁয়েমির অজুহাত দেখিয়ে তিস্তার পানির কোনো প্রাপ্তিই ঘটেনি। সে সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৬২ দফার যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছিল, সেখানে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের সংখ্যা ছিল ২২টি। অথচ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে টু শব্দটিও করেনি এবং যৌথ বিবৃতিটিও প্রকাশের কোনো আগ্রহ দেখাননি। রিজভী বলেন, স্বাধীন দুটি দেশের মধ্যে সহযোগিতায় উভয় পক্ষের প্রত্যাশা থাকে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তি মেলাতে গিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রাপ্তি শুভঙ্করের ফাঁকি, আর ভারতকে সব দিয়ে দেয়া হয়েছে উজাড় করে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভারতকে এত দিয়েছেন ভারত সারা জীবন মনে রাখবে। কিন্তু বলেননি, ভারত থেকে কী এনেছেন। আপনারা বারবার ভারত যান। আমাদের বাঁচা-মরার সমস্যা, সেই পানি সমস্যার কোনো সমাধান আনতে পারেননি। কী নির্লজ্জের মতো বলেন আমরা এটা দেখে আশ্চর্য হয়েছি। কারণ ভারত সফরে কেন গেলেন, কী করলেন, কী দিলেন এবং কী আনলেন?
সরকারের নানা অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলা বিএনপি নেতারা বরাবরই দেশে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের এ দাবির সঙ্গে আরো যোগ হয়েছে নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপ করার জন্য বারবার তাগাদা দিয়ে আসছে দলটি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপির এ দাবিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। বিএনপির অভিযোগ, দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে একটি মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে রাখা হয়েছে। সরকার প্রভাব খাটিয়ে তার জামিন পর্যন্ত দিচ্ছে না। তারপরও বিএনপি তাদের দাবি থেকে সরে আসেনি। এখনো তাদের দাবি বহাল রয়েছে।
তা সত্তে¡ও আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি পুরোদমেই চলছে বিএনপিতে। ইতোমধ্যে নির্বাচনী ইস্তেহার ও খসড়া প্রার্থী তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এলাকায় এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের গণসংযোগ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিকভাবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এবং নিজেদের সুবিধা আদায়ে নির্বাচনের আগে বিএনপির আরো অনেক নেতা ভারতসহ কয়েকটি দেশ সফরে যাবেনÑ এমন প্রস্তুতি রয়েছে দলটির ভেতরে। নির্বাচনের আগে সংবিধান সংশোধন করে কিংবা সমঝোতা করে নিরপেক্ষ সরকারে অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে সরকারের ওপর প্রবল চাপ তৈরি হয় সে পথেই হাঁটছে বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এমন একটা সময় আসবে যখন এই সরকার বুঝতে পারবে, তাদের আর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নেই। তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে অসংবিধানিক ও অনৈতিক কর্মকাÐ বন্ধের জন্য ইতোমধ্যেই সরকারকে বলা হয়েছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, দেশের স্বার্থে বিএনপি কোনোদিন কারো সঙ্গে আপস করেনি। গণতন্ত্র ছাড়া একটি দেশ কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। বিএনপি তাই গণতন্ত্রের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। সারা বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিএনপির বন্ধু। দেশের জনগণও বিএনপির পক্ষে আছে।

সৌজন্যে : ভোরের কাগজ।


Shares