প্রচ্ছদ


পরিতৃপ্ত মন

17 July 2018, 02:00

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 309 times.

শেলী সেনগুপ্তা
লোকটা এলেই ঘরের মধ্যে সেতারের সুর ছড়িয়ে পড়ে। এসেই বলে ‘খুব চমৎকার করে একটা ওয়াইন মেশাও তো বউ’।
আশালতা চটুল হাসি দিয়ে ওয়াইন মেশায়। দ্রুত হাতে কিছু চাট বানিয়ে নেয়, চিকন চিকন করে মাংস ফ্রাই করে, পাশে সাজিয়ে নেয় কিছু পেঁয়াজ কুচি, আর আধচেরা কাঁচালংকা। কখনো শশা গাজর কুচিয়ে নেয়। লোকটার সামনে সাজিয়ে দিয়ে বালিশে হেলান দিয়ে নিজেও আধশোয়া হয়। লোকটাকে প্রথম গ্লাসটা সাজিয়ে দিতে হয়, তার পরেরগুলো নিজেই ঢেলে নেয়। আশালতার গ্লাসেও ঢেলে দেয়।
যখন লোকটা খুব ফূর্তিতে থাকে তখন আশালতাকে বউ ডাকে, আশালতা হেসে ওঠে। খুব উপভোগ করে। লোকটাকে খুব প্রশ্রয় দেয়। খেলাঘরের সংসারে বউ সাজতে খুব ভালোই লাগে ওর।
লোকটা একজন স্বনাম ধন্য লেখক। মাঝে মাঝে আশালতার কাছে এসে সময় কাটায়। এসেই বলে,
ঃ বঊ, তোমার কাছে এলে আমার লেখার ঢল নামে। চলতে চলতে যখন চর পড়ে, তখন তোমার কাছে ছুটে আসি। তুমি আমার কাব্যলক্ষ্মী গো।
আশালতা শুধু হাসে। জানে সে, শুনতে হয়, কিছুই বলতে হয় না। ওরা অনেক কিছুই বলে, মেনে নিতে হয় , মনে নিতে হয় না।
বেশ কয়েক গ্লাস শেষ করে লোকটা এখন আরো প্রাণবন্ত হয়ে গেছে। আজ যেন কথায় পেয়েছে। মুখ থেকে শুধু কথা বের হয়ে আসছে। আশালতার কোলের উপর শুয়ে আছে। ওর লম্বাচুলগুলো নিয়ে খেলছে। ওর হাতের সুবাস নিচ্ছে। আঙ্গুলগুলো নিয়ে খেলছে।
ঃ বউ, লেখা আসছে না। আমাকে আজ অনেক ভালবাসবে। তারপর তোমার নাম দিয়ে বিশাল একটা উপন্যস শেষ করবো। কি? পারবো না?
ঃ পারবে তো , পারতেই হবে তোমাকে। নাহলে , আমি আশালতা কেন?
ঃ ঠিক, তুমি আমার আশালতা, শুধুই আমার।
ঃ হুম, আমি তোমার আশালতা।
ঃ বউ এমনকী হয় না, তোমার ঘরে আর কেউকেই নেবে না। শুধু আমি আসবো।
ঃ হয় , হবে না কেন? তাহলে যে আমাকে তোমার কাছে বাঁধা পরে যেতে হবে। সেটা কি ঠিক হবে?
ঃ কেন হবে না?
ঃ বাঁধা মেয়েমানুষ রাখার খরচ জানো? পারবে সে খরচ বহন করতে? তার চেয়ে এই ভাল না যখন মন চাইলো আশালতার প্রদীপে আলো জ্বেলে দিলে।
ঃ কি বলছো? আমি তো অন্ধকার, আশালতায় আমাকে আলোকিত করে। তোমার কাছ থেকে আলো নিয়ে আমি ছড়িয়ে দিচ্ছি।
লোকটা একটু একটু করে আশালতাকে নিজের দিকে টানছে। ওর ঘনচুলের ভেতর মুখ গুঁজে দিয়েছে। নাক ভরে নিশ্বাস নিচ্ছে। লোকটা গুন গুন করে গান গাইছে। লোকটা যখন বেশি রোমান্টিক হয় তখন বেসুরো কন্ঠে গান গাই। হোক বেসুরো আশালতার ভালোই লাগে। লোকটাকে তখন খুব আপন মনে হয়। গানের মধ্যে মাটির গন্ধ পায়, মিশে যেতে ইচ্ছে করে ওর গানের সাথে।
আজ যেন লোকটা একটু বেশিই ওকে ভালোবাসছে। ধীরে ধীরে ওকে বিছানায় শুয়ে দিলো। এনার্জী সেইভার লাইটের আলোতে ওকে উম্মোচন করছে। প্রতি মুহূর্তেই কথা বলছে। বলেই যাচ্ছে।
ঃ আমি একটা একটা করে ফুলের পাপড়ি উম্মোচন করবো। আমার হাতেই ফুলটা আজ প্রস্ফুটিত হবে।
আশালতার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে আবেশে। লোকটা ওর চোখে, কপালে, গন্ডে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তর্জনী দিয়ে ঠোঁটের চারপাশটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। সিঁথি ছুঁয়ে আঙ্গুলটা নাকের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে দু’ঠোঁট এপার ওপার করে নেমে এসেছে ওর গলা পর্যন্ত তারপর বুকের উপত্যকা বেয়ে নেমে যাচ্ছে। আশালতা কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিজের মধ্যে একটা আলোড়ন অনুভব করছে। লোকটার ঠোঁট ওর খোলা বাহুতে হেঁটে বেড়াচ্ছে, নাক ঘষছে পেটে, ধীরে ধীরে আরো নিচে নামছে। নাভির চারপাশ ঘিরে রেখেছে লোকটা ঠোঁট। হরিণীর নাভি থেকে কস্তুরী শুষে নিতে ব্যাকুল হয়েছে যেন।
আশালতার সাজানো ঘরে শুধু নিশ্বাসের শব্দ। একই তাললয়ে মাঝে মাঝে দু’একটা বুক কাঁপানো শীৎকার, সময় থমকে গেছে দশ ফুট বাই দশফুট এর এই ঘরে। একটা সমুদ্রকে খাঁচাবন্দি করা হয়েছে যেন। প্রবল প্রতাপশালী ঢেউগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে বের হয়ে যেতে চাইছে। সামুদ্রিক ঝড় তোলপাড় করে দিলো দু’জন মানুষকে। ঝড়ে ভেসে ভেসে একটা মহাদেশ আবিষ্কারে ব্যস্ত ওরা।
ধীরে ধীরে ঝড় থেকে গেছে। লোকটার মাথা এখন আশালতার বাহুতে। শিশুর মতো ঘুমাচ্ছে। আশালতার আঙ্গুল হাঁটছে পরিতৃপ্ত লোকটার ঘামেভেজা মাথায়, পিঠে আর রোমশ বুকে।

আশালতা বাথরুম থেকে বের হয়ে এলো। অনেক সময় নিয়ে স্নান করেছে। ওর পরনে লাল পাড় সাদা খোলের শাড়ি। মুখের ঊপরে ফোঁটা ফোঁটা জল। পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে ভেজা চুলের ঢল। লোকটা মুগ্ধ চোখে দেখছে। খুব ইচ্ছে করছে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে রাখতে। জানে এখন সে আর কাছে আসবে না। লোকটা স্নান করে এলো ওর গা মুছে দেবে , মাথা আঁচড়ে দেবে, হাতে পায়ে লোশন মেখে দেবে। ওর সেবাপরায়না মনটা লোকটাকে খুব শান্তি দেয়।

বিকেল হয়ে এসেছে। লোকটা এখন ফিরবে। আগামী সপ্তাহে আবার আসার কথা বললো। দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে আশালতা। বেশ কিছু টাকা বিছানায় রেখে লোকটা দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আশালতা টাকাটা ছুঁয়েও দেখলো না। মাথাটা নিচু করে বললো,
ঃ টাকাটা নিয়ে যাও লেখক।
ঃ সে কী? কম হলো বুঝি, ঠিক আছে, আরো দিচ্ছি।
ঃ না , কম হয়ই নি। আজ আমি টাকাই নেবো না।
ঃ কেন? কেন নেবে না ?
ঃ সারাজীবন অন্যকে তৃপ্ত করেছি। কিন্তু আজ আমিই পরিপূর্ণ তৃপ্ত, জীবনে প্রথম আমি এতোটা পরিতৃপ্ত হয়েছি। তাই টাকা আজ তুমি নিয়েই যাও। আবার যদি কখনো তোমার সাথে আমার দেখা হয় তখন নাহয় টাকা দিও।

লোকটা বের হয়ে গেলো। আশালতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিদায়ীসুর্যকে দেখছে। সূর্যের লাল রঙ ওর মুখে ছড়িয়ে পড়েছে, ওর সুখ ছড়িয়ে গেছে সূর্যের লালে।


Shares