প্রচ্ছদ


বিএনপি জনসভা পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা উত্তাপ

04 October 2018, 08:00

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 308 times.

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দীকী তালুকদার:

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি জনসভা পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। সেই- হিসেবেই
আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকারবিরোধী এক রাজনৈতিক বলয় সুস্পষ্ট হওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতে উত্তাপ ছ​ড়িয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, “নির্বাচনের আগে সরকারবিরোধী বৃহত্তর মোর্চা গঠন এবং পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”

“দেশের পরিস্থিতি এখন অনিশ্চিত। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে,” বলেন তিনি।

এর আগে শনিবার ঢাকায় পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ডেকেছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও ২০ দলীয় জোটের মূল দল বিএনপি। পরে নাটকীয় নানা ঘটনার পর শনিবার ১৪-দল এবং রবিবার বিএনপির সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ কয়েকজন জাতীয় পর্যায়ের নেতা মিলে যে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া গড়ে তুলেছেন, তা-ই মূলত চমক ও উত্তাপ সৃষ্টি করেছে।

রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে শনিবার ১৪–দলের সমাবেশে ক্ষমতাসীন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, “বিএনপি-জামায়াত জোট আর ড. কামাল-বি. চৌধুরীরা এক হয়েছে ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন বানচাল ও দেশের স্বাধীনতা ধ্বংস করতে।”

“এরা ষড়যন্ত্রের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান,” বলেন তিনি।

পর দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “খালেদা জিয়ার (কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন) ডাকে দেশবাসী এবং সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় সরকার ভীষণ ভয় পেয়েছে।” ৩০ সেপ্টেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে অনেক চেষ্টা করা হয়েছে আমাদের জনসভা পন্ডুল করার জন্য। বিভিন্ন রাস্তায় পয়েন্টে সমাবেশে আগত হাজারও কর্মীকে পথে বাঁধায় আটকে রাখা হয়েছে। তারপরও পুলিশের
এই বাঁধা অতিক্রম করে আমাদের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ঢাকার বাহিরে থেকে এসে সমাবেশে যোগ দেন।

“যে কারণে তারা এখন পদে পদে ষড়যন্ত্রের ভূত দেখতে শুরু করেছে,” যোগ করেন তিনি।

বিশ্লেষক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ ও ক্ষমতা ভোগ করার জন্য যে একবার ক্ষমতায় যায়, সে আর সরতে চায় না। আর বিরোধীরা চায় যেভাবেই হোক ক্ষমতায় যেতে। এ জন্যই এখনকার এই লড়াই ও অস্থিরতা।

“এ লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তি বাড়বে,” বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির বিভাগের এই অধ্যাপক।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া: লাভ–ক্ষতি

ড. কামাল ও বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় কার লাভ, কার ক্ষতি সেই বিশ্লেষণও চলছে রাজনীতিতে। বলা হচ্ছে, এই জোটের ফলে সরকারের ক্ষতি হয়েছে, লাভ হয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের।

“যেহেতু বিএনপি স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারছে না, সে কারণে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে দলটির দূরত্ব কমে আসবে,” বলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সংগঠন রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সাবেক সভাপতি ড. আতাউর রহমান।

তাঁর ধারণা, “ভবিষ্যতে ঐক্য প্রক্রিয়াকে ঢাল হিসেবে সামনে রেখেই বিএনপির নেতা–কর্মীরা নির্বাচনের মাঠে নামতে চাইবে। তবে সরকারও যে কোনো উপায়ে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এই ঐক্য প্রক্রিয়া যদি আপাতত বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য ভালোই হবে বলে আমি মনে করি।”

তিনি আরও বলেন, “২০১৪ সালের নির্বাচনের পর সংসদে বিরোধী দল নেই বললেই চলে। এখন দরকার সুষ্ঠু নির্বাচন; একটি কার্যকর সংসদ এবং শক্তিশালী বিরোধী দল। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন হলেই এটা সম্ভব হবে।”

স্বাগত জানিয়ে প্রতিরোধের ডাক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুরুতে এই নতুন জোটকে স্বাগত জানালেও সপ্তাহখানেক ধরে সরকারের মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বা কড়া সমালোচনা থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে যে, সরকার এতে মোটেও খুশি নয়।

১৪–দলের সমন্বয়কারী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গত সপ্তাহে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে সরকার উৎ​খাতের ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে এটি প্রতিহত করার জন্য ১৪–দলের নেতা–কর্মী ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন ১০ অক্টোবর থেকে নেতা–কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে বলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, “ওই জোটে জনসমর্থন থাকা কোনো রাজনৈতিক দল নেই। বিএনপি নিজেদের দুরবস্থা সামাল দিতে গণ-বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিচ্ছে। একে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো কারণ দেখি না।”

তার দাবি, “অতীতে ভোটের মাধ্যমে না হলেও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা ক্ষমতায় যাওয়ার পাঁয়তারা করেছিলেন। আমাদের নেতারা হয়তো এ বিষয়েই জনগণকে সতর্ক করছেন।”

অন্যদিকে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমেদ বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর আমাদের বিশাল জনসভা দেখে সরকার ভিতু হয়েছে। তারিসাথে সমাবেশ পরবর্তী আমাদের দলের সিনিয় অসংখ্য নেতাকে মিথ্যা মামলা দিয়েছে।সমাবেশ থেকে ফেরার পথে আমাদের তিন শতাধিক কর্মী কে গণ- গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে সরকার’ “সমালোচনাতেই প্রমাণিত হয়, বৃহত্তর ঐক্য দেখে সরকার আতঙ্কিত ও বিচলিত হয়ে পড়েছে।” তিনি মওদুদ বলেন ১০ অক্টোবর থেকে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে নেতা–কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্যতম নেতা এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বেনারকে বলেন, “দেশব্যাপী বৃহত্তর ঐক্যের ব্যানারে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করা হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন, সংসদ ভেঙে দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক কর্মসূচি চলবে।”

সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে ঐক্যের সূচনা হলেও শিগগিরই এটি নির্বাচনী মোর্চায় রূপ নেবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

“একক নেতৃত্বের পরিবর্তে যৌথ নেতৃত্বে জোট পরিচালনার জন্য শিগগির একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সারা দেশে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে,” বলেন রতন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আতাউর বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর রোরবার রাজধানী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভা সরকারকে একটি ষ্ট্যাম্প কার্ড বার্তা দিয়েছে। “অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি ফের সহিংসতা দিকে যাচ্ছে। মূলত সরকারই নানাভাবে বিরোধীদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করবে, যাতে নির্বাচনের আগেই কঠোরভাবে দমন করা যায়।”

ড. কামাল, বি. চৌধুরীসহ ঐক্য প্রক্রিয়ার অনেক নেতাই জামায়াতকে সঙ্গে রাখতে চান না। অথচ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান শরিক জামায়াত। বিএনপি জামায়াতকে ছাড়বে কিনা, তা এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট করেনি।

তবে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন বাতিল করায় জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনে অংশ না নিতে পারলেও রাজনীতিতে জামায়াতের প্রভাব রয়ে গেছে। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে দেখা গেছে, ভোটের হিসাবে তাদের অবস্থান তৃতীয়। যে কারণে যুদ্ধাপরাধীদের দল হলেও বিএনপি তাদের দূরে ঠেলছে না।

তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ​২০–দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নির্বাচনী মোর্চা বেশি দূর এগোতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, অক্টোবর মাস অনেক টার্নিং পয়েন্ট এই মাসে রাজনৈতিক অবস্থা মারাত্মক সংকটে পড়বে। বিএনপি ৩০  সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী মাঠে একক ভাবে তাদের শক্তি প্রদর্শন  করেছে । তাদের এই সমাবেশে এত পরিমাণ লোকের সমাগম হবে সেই- বিষয়টি সরকার’ও অনুধাবন করতে পারেনি। “নির্বাচন সামনে রেখে ছোট–বড় দলগুলোর ঐক্য হওয়াটা স্বাভাবিক। এর মাধ্যমে ছোট দলগুলো তাদের বড় প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে পারছে।”

“কিন্তু শঙ্কার কথা যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে জামায়াতে ইসলামী আছে। জামায়াত সরাসরি যুক্ত না হলেও বিএনপির সঙ্গে ছায়া হিসেবে নতুন জোটে থাকছে,” যোগ করেন এই বিশ্লেষক।

ড. মনজুর আরো বলেন, “এই অবস্থায় বিএনপিকে সাথে নিয়ে ড. কামাল ও বি. চৌধুরীর পথ চলা স্থায়ী হবে কিনা এবং সেটা হলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ সেটা কীভাবে নেবে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে।”


Shares