প্রচ্ছদ


কিছু স্মৃতির দেয়ালে ছবি হয়ে থাকবে আমরণ…

26 February 2019, 01:04

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 888 times.

প্রতিটা সন্তানের কাছে বাবা হচ্ছে তাঁর প্রথম হিরো।
আমারও প্রথম হিরো হচ্ছেন আমার বাবা।।

প্রিয়া ঘোষাল : বাংলাদেশে যখন পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ চলছিল, তখন আমার দুই কাকাবাবু যুদ্ধে চলে যান। আমার বাবা আর কাকু তিন ভাই বাবা ছোট ছিলেন বলে দাদু ঠাকুমা আর মা বাবাকে পাঠিয়ে দেন নানুর বাড়ি শিলিগুড়ি। যুদ্ধ শেষ কিন্তু আমার কাকাবাবুদের হদিস আজও মেলেনি। আমাদের ভিটা বাড়ি ওখানকার লোকজন দখল করে নিলো তাই আর বাংলাদেশে ফেরা হয়নি।

দাদু আর বাবা কলকাতায় কাপড়ের ব্যবসা শুরু করলেন, ভালোই চলছিলো। অনেক খুজাখুজি করেও কাকাবাবুদের সন্ধান মিললোনা, কাকুদের শোকে দাদু গত হলেন কিছু দিনের ব্যাবধানে ঠাকুমাও।

আমার জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৮৪ পৃথিবীর আলো দেখলাম, ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৮ ভাই পৃথিবীর আলো দেখলো। খুব আনন্দের সাথে দিন কাটছিল। কিন্তু আনন্দটি বেশি দিন থাকলো না। বাবা অ্যান্ড্রোক্রাইন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। টাকার জন্য চিকিৎসা করতে পারছিলেন না। আমাদের কাউকেই বুঝতে দেননি। ২৭ মার্চ ১৯৯৪, বাবা রাতে ঘুমলেন…….
বাবার আর ঘুম ভাঙল না।

বাবাকে হারিয়ে আমরা তখন দিশেহারা,, কাপড়ের দোকানটি আর থাকলো না। মা আমাদের নিয়ে আর নানুর বাড়ি ফিরলেন না!
একটি সেলাই মেশিন ছিলো ওটা দিয়েই জীবিকার তাগিদে কাজ করতে লাগলেন, কখনো এ দোকান থেকে কখনো ও দোকান থেকে অডার এনে কাজ করতেন।আমাদের তখন নুন আনতে পান্তা ফুরায়।
আর যখন অডার না আসতো তখন শুধু জল খেয়ে থাকতাম। কত রাত না খেয়ে কাটিয়েছি হিসেব নেই।

শত কষ্টের মাঝেও পড়াশোনাটা দুজনই চালিয়ে যাচ্ছিলাম। যখন একটু বুঝতে শিখলাম, তখন পরিবারের আর্থিক উন্নতির জন্য চাকরি খুজতে শুরু করলাম৷ কিন্তু বয়স আর যোগ্যতার অভাবে কোথাও কাজ পাচ্ছিলাম না।
অবশেষে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ পেলাম প্লেট পরিস্কার এবং সবজি কাটার। কাজটি পারটাইম জব হিসেবে করছিলাম অন্তত পড়ার খরচটা তো আসুক। এমনো সময় এসেছিলো নিজের ব্লাড বিক্রি করে পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করেছি। মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে টিউশনি করতে শুরু করলাম৷ কিছু টাকা যখন জমা হয়ে গেলো তখন বিভিন্ন তাঁতিদের কাছ থেকে নকশি করা শাড়ি,পাঞ্জাবি, কাথা, এধরনের কিছু গার্মেন্টস কাপড়, কাপড়ের দোকানে সেল করতে শুরু করলাম,খুব ভালো সাড়া পেলাম।
কতো মাইলের পর মাইল হেটেছি। অনেক সময় পা ভীষণ রকম ব্যাথা করতো।
ভালো একটি এনজিও তে জবের অফার পেলাম।
এখন জবও করি ব্যবসা সাথে তো পড়াশোনা আছেই।
টিউশনি ছেড়ে দিলাম। পরে আরো কয়েকটি জব পরিবর্তন করলাম৷
ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল অয়েলফেয়ার এন্ড বিজনেস মেনেজমেন্ট থেকে এম.বি.এ করলাম।
আর ভাই ততদিনে স্কলারশিপে অস্ট্রেলিয়া চলে গেলো।

আর আজকের এই দিনে, একটি শুনামধন্য প্রাইভেট কোম্পানির ইনচার্জে নিয়োজিত আছি।
একটি কাপড়ের শোরুম, একটি পার্লার, তিনটি মার্কেট, পাঁচটি বাড়ি, একটিতে স্বপরিবারে থাকি বাকি চারটে ভাড়ায় আছে। আরো কিছু ছোটখাটো ব্যাবসাও আছে। এক সময় কত পথ হেটেছি মাইলের পর মাইল, আর আজ আমার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তিনটি গাড়ি। এখন আর পিছু ফিরে তাকালে, সেই দিনগুলো দেখা যায়না কিন্তু স্মৃতির দেয়ালে ছবি হয়ে থাকবে আমরণ। আজ আমার সব আছে শুধু নেই বাবা তুমি। এখনো নিরবে কাদি যখন মনে পড়ে টাকার জন্য তুমার চিকিৎসা করাতে পারিনি।

লেখাটি প্রিয়া ঘোষালের ফেসবুক থেকে নেয়া। যুগপৎ অনলাইন পত্রিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সকল স্বদেশী ও মিত্রদেশ ভারতের শহীদদের জন্য কৃতজ্ঞচিত্তে প্রকাশ করা এবং বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা …


Shares