প্রচ্ছদ


একজন ডাক্তার স্বপ্নীল ও অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ

18 April 2019, 11:00

নিজস্ব প্রতিবেদক
This post has been seen 489 times.

 

সৌমিত্র দেব
অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)এর সঙ্গে আমার পরিচয় আকস্মিক ভাবে । প্রখ্যাত অভিনেতা ও ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে প্রথম তার কথা বলেছিলেন । মৌলভীবাজারে সম্প্রীতি বাংলাদেশ’-এর অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলাম আমি ।সেই অনুষ্ঠানে স্বপ্নীল ভাইয়ের যাওয়ার কথা ছিল । কিন্তু পরে জানলাম ওই দিনে ব্রাম্মণবাড়িয়ায় তার অন্য প্রোগ্রাম থাকায় তিনি আমাদের অনুষ্ঠানে থাকতে পারছেন না । গাড়ি যোগে আমরা রওয়ানা হলাম । পীযূষদার সঙ্গে আরো গেলেন ডক্টর সাজেদুল আউয়াল ।পথে যাত্রা বিরতি । উজান ভাটিতে দেখা হয়ে গেল স্বপ্নীল ভাইয়ের সাথে । অল্প সময়ের আলাপ । কিন্তু দারুন ভাব জমে গেল আমাদের । বুঝে নিলাম উদার এবং মুক্তচিন্তার এই মানুষ দেশের জন্যই একজন রত্ন । কিছু দিন আগে কবিতা ক্যাফেতে “বিষয় বঙ্গবন্ধু’ নামে এক অনুষ্ঠান করেছিলাম । সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) । তার বক্তব্যে আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম সেদিন ।
বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী স্বপ্নীল ইউরোএশিয়ান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিক্যাল এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি ক্রোয়েশিয়ার স্প্লিটে অনুষ্ঠিত এসোসিয়েশনের বার্ষিক সম্মেলনে তিনি এই পদে নির্বাচিত হন। ইউরোএশিয়ান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিক্যাল এসোসিয়েশনের ইউরোপ এবং এশিয়ামহাদেশের লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। অধ্যাপক স্বপ্নীল বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসাবে কর্মরত আছেন।পাশাপাশি তিনি জাপানের এহিমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও মেটাবোলজি বিভাগের ভিজিটিং রিসার্চার।
অধ্যাপক স্বপ্নীল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৯৫ সালে এম.বি.বি.এস, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৮ সালে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিতে এম.এস.সি. এবং ২০০৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হেপাটোলজিতে এম.ডি. ডিগ্রী অর্জন করেন।তিনি আমেরিকান কলেজ অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, ইন্ডিয়ান কলেজ অব ফিজিসিয়ানস, রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অব আয়ারল্যান্ড এবং রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অব লন্ডনের ফেলো।
বাংলাদেশের লিভার বিশেষজ্ঞদের জাতীয় সংগঠন‘এসোসিয়েশন ফর দি স্টাডি অব লিভারডিজিজেজ বাংলাদেশ’-এর তিনি জেনারেল সেক্রেটারী এবং‘সাউথ এশিয়ান এসোসিয়েশন ফর দি স্টাডি অব দি লিভার’-এরও সাধারণসম্পাদক। তিনি এশীয়-প্রশান্তমহাসাগরীয় লিভার এসোসিয়েশনের হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিসসি, একিউট অন ক্রনিক লিভার ফেইলিউর এবং লিভার ফাইব্রোসিস সংক্রান্ত গাইডলাইন কমিটি গুলোর সদস্য।
এ পর্যন্ত তিনি লিভার বিষয়ক বেশ কয়েকটি টেক্সট বই সম্পাদনা করেছেন। এরমধ্যে ‘লিভার’ প্রকাশ করেছে এলসেভিয়ের, ‘টেক্সট বুক অব হেপাটাইটিসবি’, ‘টেক্সট বুক অব হেপাটো গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি’ ও ‘হেপাটো গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি প্রেসক্রাইবার’-এর প্রকাশক জেপি ব্রাদার্স, ইন্ডিয়া আর‘ফ্যাটিলিভারডিজিজ’ ও ‘হেপাটাইটিস ম্যানেজমেন্ট আপডেট’ বই দুটি প্রকাশিত হয়েছে ম্যাকমিলান পাবলিশার্স থেকে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বৈজ্ঞানিক জার্নালে তার দুইশতাধিক প্রকাশনা রয়েছে।তিনি ইউরোএশিয়ান জার্নাল অব হেপাটোগ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির কো-এডিটর-ইন-চিফ। এছাড়াও জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল এন্ড এক্সপেরিমেন্টাল হেপাটোলজিসহ লিভারবিষয়ক বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জার্নালের এডিটোরিয়াল বোর্ডের তিনি সদস্য।
হেপাটাইটিস বি চিকিৎসায় নতুন ওষুধ ন্যাসভেক নিয়ে গবেষণা অধ্যাপক স্বপ্নীলের অন্যতম কৃতিত্ব। এ দেশে ন্যাসভেকের ফেইজ ১/২ ও ফেইজ ৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তিনি প্রিন্সিপ্যাল ইনভেস্টিগেটর। তার গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে ওষুধটি এরইমধ্যে কিউবা, নিকারাগুয়া, ইকুয়েডর, বেলারুশ ও এ্যাঙ্গোলায় রেজিষ্ট্রেশন পেয়েছে এবং বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ওষুধটির রেসিপি অনুমোদন করেছে।
অধ্যাপক স্বপ্নীল বাংলাদেশে লিভার ক্যান্সার চিকিৎসায় সর্বাধুনিক পদ্ধতি ট্রান্স-আর্টারিয়াল কেমো-এম্বোলাইজেশন (টেইস)-এরও পুরোধা এবং এদেশে নিয়মিতভাবে এই পদ্ধতি তেলিভার ক্যান্সারের চিকিৎসা করে থাকেন। পাশাপাশি লিভার ফেইলিওরে অটোলোগাসহেমোপয়েটিকস্টেম সেলট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ও লিভার ডায়ালাইসিসের ও পথিকৃত অধ্যাপক স্বপ্নীল। এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো এরইমধ্যে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে। ভয়েস অব আমেরিকা ও বিবিসি বাংলা এ নিয়ে তার সাক্ষাৎকারও সম্প্রচারকরেছে।
তিনি ২০১৩ সালে‘ আমেরিকান এসোসিয়েশন ফর দা স্টাডি অব দা লিভার’-এর ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ডিস্টিংশন’ অর্জন করেন আর ২০১৪ সালে ‘ইউরোএশিয়ান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিক্যাল এসোসিয়েশন’ কর্তৃক ‘অর্ডার অব মেরিট’-এ ভূষিতহন। ভারতের ’কলিঙ্গ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিক্যাল ফাউন্ডেশন’ তাকে ২০১৫ সালে সম্মানসূচক‘ ব্লুমবার্গ ওরেশন’প্রদানকরে। ২০১৬ সালে তিনি ভারতের চেন্নাই-এর‘ ভেনাস রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ থেকে ’ডিসটিংগুইশড সাইন্টিস্ট (হেপাটোলজি)’ পদক লাভ করেন। ২০১৭ সালের ‘ হুজ হু-তে তার জীবনী অর্ন্তভূক্ত হয়েছে। তিনি ২০১৮-তে ‘মার্ক্ইুসহুজহু’ কর্তৃক ‘এলবার্ট নেলসন মার্কুইস লাইফটাইম এচিভমেন্টএওয়ার্ড’ এ ভুষিত হন। ‘বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ’ তাকে ‘বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো স্বর্ন পদক ২০১৮’ প্রদানকরেছে।
এছাড়াও তার গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর দি স্টাডিঅব দি লিভার’, ‘ওয়ার্ল্ড গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অর্গানাইজেশন’, ‘এশিয়ান-প্যাসিফিক এসোসিয়েশন ফর দি স্টাডিঅব দি লিভার’, ‘এশিয়া-প্যাসিফিক প্রাইমারী লিভারক্যান্সার এক্সপার্ট গ্রুপ’, ‘জাপান সোসাইটিঅব হেপাটোলজি’, ‘টার্কিশ সোসাইটি অব হেপটো-বিলিয়ো-প্যানক্রিয়াটোলজি’ এবং ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর দি স্টাডিঅব দি লিভার’ কর্তৃক পুরস্কৃত হয়েছেন।
স্ত্রী ডাঃ নুজহাত চৌধুরী, শহীদ বুদ্ধিজিবী ডাঃ আব্দুলআলীম চৌধুরী এবংশহীদ জায়া বেগম শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী (একুশেপদকপ্রাপ্ত)-এরকনিষ্ঠকন্যা। ডাঃ নুজহাত বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চক্ষুবিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
প্রফেসর মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)এর ছাত্র শওকত হোসাইন রোমেল তাকে নিয়ে লিখেছেন ,” একজন অসাধারণ চিকিৎসক, অসাধারণ শিক্ষক, একজন অসাধারণ ব্যাক্তিত্ব এবং বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। আমি আমার ক্ষুদ্র ডাক্তারি জীবনে এত মেধাবী মানুষ এখন পর্যন্ত দেখিনি। আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে, ছাত্র হিসাবে তাঁর মত একজন মেধাবী মানুষের সংস্পর্শ ও সহচর্যে আসার সুযোগ আমার হয়েছে। এদেশের লিভার চিকিৎসাকে স্যার এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। প্রচলিত লিভারের চিকিৎসার (Conventional Hepatology) বাহিরে যুগোপযোগী, অত্যাধুনিক লিভারের চিকিৎসার (Interventional Hepatology) যাত্রা স্যারের হাত দিয়েই এদেশের মাটিতে শুরু হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেইঃ
He is the father of interventional Hepatology in Bangladesh
তাঁর অসামান্য দক্ষতা ও নৈপুণ্যের ফলশ্রুতিতে আজ বাংলাদেশেই বিশ্বমানের লিভারের চিকিৎসা সূচিত হয়েছে। লিভার ক্যান্সার চিকিৎসায় TACE (Trans arterial chemoembolization), RFA (Redio-frequency ablation) পদ্ধতি স্যারের হাত দিয়েই এদেশে শুরু হয়েছে। লিভার সিরোসিসের প্রচলিত চিকিৎসার বাহিরে Stem cell therapy এবং সর্বশেষ Liver dialysis in hepatic failure স্যারের এক অনন্য অবদান। ডঃ শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর স্যার এবং প্রফেসর মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) স্যারের যৌথ গবেষণায় আবিষ্কৃত ন্যাসভ্যাক (NASVAC) ঔষধটি বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের উপর প্রয়োগ করে অত্যন্ত আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া গিয়েছে। তাই বলতেই পারি হয়তবা আমরা হেপাটাইটিস বি ভাইরাস জয়ের দ্বারপ্রান্তে অবস্হান করছি। দেশের সীমানা পেরিয়ে আজ বাংলাদেশের হেপাটোলজী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুলভাবে সমাদৃত। আর এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) স্যারের জন্য। ১৬৬ টি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রের লেখক এবং হেপাটোলজীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গাইডলাইন কমিটির সন্মানিত সদস্য আমাদের স্বপ্নীল স্যার।
স্যার হচ্ছেন সেই মানুষ যিনি শুধুমাত্র নিজের কথা চিন্তা না করে সবসময় উনার হেপাটোলজি পরিবারটির কথা চিন্তা করেন। আমরা আমাদের স্যারের কাছে মন খুলে সব সুবিধা অসুবিধার কথা বলতে পারি। নবীণ লিভার বিশেষজ্ঞদের আরও দক্ষ ও যুগোপযোগী করে তৈরি করার জন্য স্যার স্ব উদ্যোগে নিজের অবস্হানকে কাজে লাগিয়ে তাদের জন্য দেশে বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছেন।
দেশের লিভার চিকিৎসার সার্বিক উন্নয়নে এই মানুষটি দিন-রাত প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে চলেছেন। “
আমি মনে করি ডাক্তার স্বপ্নীলের মতো মানুষের কারণে বাংলাদেশকে আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না । আমাদের দেশ হয়ে উঠবে অপ্রতিরোধ্য ।

সৌমিত্র দেব :অনলাইন গণমাধ্যম রেডটাইমস ডট কম ডট বিডির প্রধান সম্পাদক


Shares