100 GB Free Backup
This post has been seen 368 times.

সুমন দেঃ ওগো আমার আগমনী  এই কন্ঠেই ছোটবেলায় এই গানটি শুনে শুনে বড় হয়েছি। শরতের ভোরে রেডিওতে আকাশবানী কলকাতা থেকে সম্প্রচার হত, বাবা মহালয়ায় ঘুম থেকে তুলতেন ভোররাতে, বাসার সবাই জড় হয়ে একসাথে শুনতাম। আজও সেই স্মৃতি হৃদয়ে বয়ে-চলেছি। আজ বাবা নেই, শরতের ভোর এসেছে, আগমনীর বার্তা নিয়ে দেবীদূর্গা আসছেন। প্রকৃতির কি লিলা? এখন আমি আমার ছেলেকে ঘুম থেকে উঠাতে হবে, ভিজুয়াল ডিজিটাল যুগ, সে দেখবে লাইভ-শো টিভিতে। আমি শহরেই জন্মথেকে বেড়ে উঠেছি, শহরে শরতের ঋতুর কিছু কিছু বুঝতে পেরেছি, পেরেছি উপলব্ধি করতে। গ্রামে আমার মামার বাড়ি, সেখানে হিসেব নেই কতবার গেছি আর কোন ঋতুতে যাই নাই। বই পড়ে আর রবীন্দ্র সংগীত শুনে শুনে প্রতিটা ঋতুই যেন চোখে ভাসে।

“বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে । স্থলে জলে নভতলে বনে উপবনে নদীনদে গিরিগুহা-পারাবারে নিত্য জাগে সরস সঙ্গীতমধুরিমা, নিত্য নৃত্যরসভঙ্গিমা “ –

“আশ্বিনে নব আনন্দ, উৎসব নব ।

অতি নির্মল, অতি নির্মল, অতি নির্মল উজ্জ্বল সাজে ভুবনে, নব শারদলক্ষ্মী বিরাজে ।

নব ইন্দুলেখা অলকে ঝলকে, অতি নির্মল হাসবিভাসবিকাশ আকাশনীলাম্বুজ-মাঝে শ্বেত ভুজে শ্বেত বীণা বাজে –

উঠিছে আলাপ মৃদু মধুর বেহাগতানে, চন্দ্রকরে উল্লসিত ফুল্লবনে ঝিল্লিরবে তন্দ্রা আনে রে ।

দিকে দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা॥”- রবীন্দ্রনাথের এই গনেই ষড়ঋতুর কথা উল্লেখ আছে।

দেবী দুর্গার আবির্ভাব হয়েছে প্রকৃতি থেকে। মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গচ্যুত দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নিলে ব্রহ্মা, শিব ও অন্য সকলকে নিয়ে বিষ্ণুর কাছে আসেন ৷ তাঁদের দুর্দশার কথা জানিয়ে তাঁরা ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেন, এর থেকে মুক্তির পথ কী ? স্বয়ং ব্রহ্মার দেওয়া বরেই মহিষাসুরকে বধ করতে পারবেনা কোনও পুরুষ ৷ বিষ্ণু এর উত্তরে বলেন, এই পরাক্রমশালী অসুরকে বধ করতে হলে নিজের নিজের স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে নিজ নিজ তেজের কাছে প্রার্থনা করতে হবে যে তাঁদের মিলিত তেজ থেকে যেন এক নারীমূর্তির আবির্ভাব হয় ৷ বিষ্ণুর কথা মতো কাজ শুরু করেন দেবতারা ৷ দেবতাদের দেহ থেকে তেজ নির্গত হয়ে সৃষ্টি হয় এক অপরূপা দেবীর ৷ নারীদের প্রতাপশালী ও নারীদের দূর্গতি নাশিনী রূপে আবির্ভুত করেন। তার মধ্যে ছিলেন স্বয়ং ব্রহ্মা, শিব, বিষ্ণু ও ইন্দ্র৷ দেবতারা তাঁদের নিজেদের অস্ত্র এই দেবীকে দান করেন ৷ পুরুষদের ‘অবাধ্য’ মহিষাসুরকে তিন বার বধ করেন এই দেবী ৷ প্রথম বার অষ্টদশভূজা উগ্রচণ্ডা রূপে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বার দশভূজা দুর্গারূপে ৷ রাতে স্বপ্নে ভদ্রকালীর মূর্তি দেখে মহিষাসুর বলেন, “আপনার হাতে মৃত্যু হতে আমার কোনও দুঃখ নেই ৷ কিন্তু আমিও যেন আপনার সঙ্গে পুজিত হই, তারই ব্যবস্থা করুন ।” দেবীর উত্তর, “উগ্রচণ্ডা, ভদ্রকালী ও দুর্গা—এই তিন মূর্তিতে তুমি সব সময় আমার পদতলে থেকে দেবতা, মানুষ ও রাক্ষসদের পূজ্য হবে ৷দেবী দুর্গা মহাদেবের স্ত্রী ৷” 

দুর্গাপূজায় মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরাঘুরি। দেবী দর্শন।

 

শ্বর এক ও অভিন্ন, নাম শুধু ভিন্ন ভিন্ন। পূজা করতে চাই ভক্তি ও আনন্দ নিয়ে। পূজার আনন্দ ভাগ করে নিতে চাই সকলে মিলেমিশে। শরত মানেই হাল্কা হিমহিম, বাইরে তাকিয়ে ঘাসের গায়ে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ শিশিরের বিন্দু। সব সকাল, দোয়েল-শ্যামার ডাক, শিশিরে ভেজা অমৃত গন্ধা সাদা শেফালি, বয়ে যাওয়া বর্ষায় ভরা নদী, দুই পাড়ে তার সফেদ শুভ্র কাশের গুচ্ছ, আর ঘন নীল আকাশ জুড়ে জলশূন্য সাদা মেঘের ভেলা, প্রকৃতি যেন তার বরণ ডালা নিয়ে প্রস্তুত। সেই ছোট্ট বেলা থেকে জেনে এসেছি, প্রকৃতির অপরূপ রূপে এই যে সাজ-সজ্জা সে শারদীয় উৎসবের সাজ, প্রকৃতি ব্যস্ত আরাধনায়। শরতে জগজ্জননী দুর্গার আরাধনা হয়, সবার অন্তরে অন্তরে মায়ের আগমনীর সুর বেজে ওঠে।

দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হল হিন্দু দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত একটি উৎসব। দুর্গাপূজা সমগ্র হিন্দুসমাজেই প্রচলিত। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজে এটি অন্যতম বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং চৈত্র মাসের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। শারদীয়া দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বেশি। বাসন্তী দুর্গাপূজা মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হওয়ার দরুন বাংলাদেশ। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে “দুর্গাষষ্ঠী”, “মহাসপ্তমী”, “মহাঅষ্টমী”, “মহানবমী” ও “বিজয়াদশমী” নামে পরিচিত। “বিজয়াদশমী” দিনে মাকে সিদুর দেয়ার পর আবার একে অন্যকে সিদুর পরানোর রিতি রয়েছে।

সিঁদুর খেলা ছবি-সুমন দে।
সিঁদুর খেলা, ছবি-সুমন দে।

আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় “দেবীপক্ষ”। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া; এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়।

শরৎকালের সব সময় সতেজ আবহাওয়া বাংলাদেশে । আকাশ ঝকঝকে নীল আর তুলোর মত সাদা। মনের ভেতর ঢাকের বোল শুনতে পাচ্ছি, দুর্গাপূজা এসে গেলো। পুলিশ পাহারা দিয়ে দুর্গাপূজা করতে চাইনা। হানাহানি, ঝগড়াঝাঁটিতে শারদীয় উৎসবে জড়াতে চাইনা। আমার সকল ভাই বোন বন্ধুকে জানাই শারদীয়ার অগ্রিম শুভেচ্ছা ও প্রীতি। দুর্গাপূজা বয়ে আনুক আমাদের সকলের মাঝে সম্প্রীতি ও সুখের বার্তা। জগতের সবার মঙ্গল হোক।।

http://jugapath.com/wp-content/uploads/2016/09/unnamed-7-e1475221058942.jpghttp://jugapath.com/wp-content/uploads/2016/09/unnamed-7-e1475221058942-150x150.jpgjugapathমুক্তমতসংস্কৃতিসম্পাদকীয়সুমন দেঃ ওগো আমার আগমনী  এই কন্ঠেই ছোটবেলায় এই গানটি শুনে শুনে বড় হয়েছি। শরতের ভোরে রেডিওতে আকাশবানী কলকাতা থেকে সম্প্রচার হত, বাবা মহালয়ায় ঘুম থেকে তুলতেন ভোররাতে, বাসার সবাই জড় হয়ে একসাথে শুনতাম। আজও সেই স্মৃতি হৃদয়ে বয়ে-চলেছি। আজ বাবা নেই, শরতের ভোর এসেছে, আগমনীর বার্তা নিয়ে দেবীদূর্গা আসছেন। প্রকৃতির...

Comments

comments